দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটীয় ভূরাজনীতিতে যখন আইপিএল নিয়ে এক ধরণের টানাপোড়েন চলছে, ঠিক তখনই পাকিস্তানের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি আসর ‘পাকিস্তান সুপার লিগ’ (পিএসএল)-এ বাংলাদেশিদের আধিপত্য এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ভারতের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই লাহোর-করাচির ময়দানে বাংলাদেশি তারকারা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ সম্মান ও মূল্যায়ন।
শনিবার পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) আসন্ন পিএসএলের জন্য ড্রাফট তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ড্রাফটে নাম থাকা বিদেশি ক্রিকেটারদের তালিকায় সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থানে রয়েছে। তালিকায় স্থান পেয়েছেন মোট ৫০ জন বাংলাদেশি ক্রিকেটার, যা দেশটির ক্রিকেট ইতিহাসে এক বিরল রেকর্ড। এই তালিকায় বাংলাদেশের উপরে আছে কেবল অস্ট্রেলিয়া (৬০) ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ (৫৭)।
ইতিমধ্যেই কাটার মাস্টার মুস্তাফিজুর রহমান লটারি ছাড়াই নিজের জায়গা নিশ্চিত করে ফেলেছেন। সরাসরি চুক্তিবদ্ধ হওয়া ছয় জন বিদেশি ক্রিকেটারের একজন হিসেবে তিনি নাম লিখিয়েছেন লাহোর কালান্দার্সে। তবে ড্রাফটের মূল আকর্ষণ হয়ে আছেন অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান এবং উইকেটকিপার ব্যাটার মুশফিকুর রহিম। তাদের সঙ্গে চমক হিসেবে যুক্ত হয়েছেন জাকির হাসান। এই তিনজনের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ পাকিস্তানি রুপি, যা ড্রাফটে থাকা ক্রিকেটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নিলামের তালিকায় জাতীয় দলের বর্তমান তিন অধিনায়কের নামও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস, ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ এবং টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত—প্রত্যেকেই ১ কোটি ১০ লাখ রুপি ভিত্তিমূল্যের ক্যাটাগরিতে রয়েছেন। একই ক্যাটাগরিতে আছেন তাওহীদ হৃদয়, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলামের মতো পারফর্মাররা।
পিসিবি প্রকাশিত তালিকায় দেখা গেছে, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশের তুলনায় বাংলাদেশিদের প্রতি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আগ্রহ এবার অনেক বেশি। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নতির ছাপ পড়েছে এই তালিকায়। আনক্যাপড ও উদীয়মান ক্রিকেটারদের জন্য রাখা ৬০ লাখ রুপি ক্যাটাগরিতেও সাব্বির রহমান ও মোহাম্মদ নাঈমদের পাশাপাশি অনেক নতুন মুখ জায়গা পেয়েছেন।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, আইপিএলে মুস্তাফিজের দল পেয়েও বাদ পড়ার ঘটনাটি বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেটীয় সম্পর্কের মাঝে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু পিএসএল ড্রাফটে এত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশির অন্তর্ভুক্তি এবং বড় অংকের ভিত্তিমূল্য দুই দেশের ক্রিকেটীয় ও কূটনৈতিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নিলামে এই ৫০ জনের মধ্যে কতজন শেষ পর্যন্ত দল পান, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়, এবারের পিএসএল ড্রাফটে নজর কেড়েছে বেলজিয়াম (১০), রুয়ান্ডা এবং মালয়েশিয়ার মতো অপ্রচলিত ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোও। তবে বড় নামগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সাকিব-মুশফিকদের প্রতি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর কাড়াকাড়ি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। পাকিস্তানের উইকেটে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পূর্ব অভিজ্ঞতা লিগের জয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আসন্ন পিএসএল আসরটি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য কেবল আর্থিক লাভের সুযোগই নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের একটি বড় মঞ্চ হতে যাচ্ছে। সাকিব-মুস্তাফিজরা যদি সেখানে জ্বলে উঠতে পারেন, তবে তা ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে অন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতেও বাংলাদেশিদের কদর আরও বাড়িয়ে দেবে।

