শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নেটওয়ার্কের ওপর স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। শনিবার রাতভর চালানো এই অভিযানে কয়েকশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে কিয়েভ। যখন দেশটির তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নামতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই এই সুপরিকল্পিত হামলা ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জনজীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলার ভয়াবহতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, রুশ বাহিনী অন্তত ৪০০টি ড্রোন এবং প্রায় ৪০টি বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সাবস্টেশনগুলোকে লক্ষ্য করেই এই অভিযান চালানো হয়। জেলেনস্কির মতে, এটি কেবল সামরিক অভিযান নয়, বরং সাধারণ মানুষকে শীতের প্রকোপে জিম্মি করার এক পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে ইউক্রেনের তাপমাত্রা মাইনাস ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যেতে পারে। এমন হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানে হলো লাখ লাখ মানুষের হিটিং সিস্টেম বা ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়া। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো এখন আপ্রাণ লড়াই করছে।
ইউক্রেনের জ্বালানি মন্ত্রী দেনিস শ্মিহাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, পশ্চিম ইউক্রেনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেশ কিছু বড় সাবস্টেশন ও সঞ্চালন লাইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, পুরো দেশে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। গ্রিড ধসে পড়া আটকাতে প্রতিবেশি পোল্যান্ডের কাছ থেকে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ আমদানির অনুরোধ জানিয়েছে কিয়েভ।
আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লভিভ, রিভনে, তেরনোপিল এবং ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্কের মতো পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই এলাকাগুলো সাধারণত তুলনামূলক নিরাপদ মনে করা হলেও, এবার রুশ ড্রোনগুলো সুদূর পশ্চিম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে এবং সংযোগ পুনর্স্থাপন করতে প্রকৌশলীরা কাজ শুরু করলেও ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।
ইউক্রেনের বৃহত্তম বেসরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিটিইকে’ (DTEK) জানিয়েছে, তাদের ওপর এটি ছিল ২০২৫ সালের অক্টোবরের পর থেকে দশম বড় ধরনের হামলা। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বারবার মেরামত করার পরও একের পর এক হামলায় অবকাঠামো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। এবারের হামলায় তাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে যা মেরামত করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই হামলা এমন এক সময়ে চালানো হলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বিরতির আলোচনা নিয়ে কিছুটা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। গত কয়েক দিনে কূটনৈতিক মহলে পর্দার আড়ালে কিছু তৎপরতা লক্ষ্য করা গেলেও, মাঠের লড়াইয়ে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। উল্টো রাশিয়ার এই বিশাল আক্রমণ প্রমাণ করে যে, আলোচনার টেবিলে বসার আগে মস্কো কিয়েভকে সর্বোচ্চ চাপে রাখতে চায়।
মস্কো বরাবরের মতোই এই সুনির্দিষ্ট হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে ক্রেমলিন এর আগে একাধিকবার বলেছিল যে, ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা ও তার সহায়ক অবকাঠামো তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু। ইউক্রেনীয়দের দাবি, রাশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়া।
এদিকে ইউক্রেন সীমান্ত সংলগ্ন দেশগুলোতেও এই হামলার প্রভাব অনুভূত হয়েছে। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পোল্যান্ড তাদের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দুটি বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়। আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর অবশ্য কয়েক ঘণ্টা পরে বিমানবন্দরগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়।
ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ এখন এক কঠিন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ফ্রন্টলাইনে সেনাদের লড়াই, অন্যদিকে পেছনের সারিতে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক জায়গায় পানি সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। শহরগুলোর মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে জরুরি ‘ইনভিসিবিলিটি সেন্টার’, যেখানে মানুষ অন্তত ফোন চার্জ করা বা একটু উষ্ণ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া শীতকালকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়ার মাধ্যমে তারা ইউক্রেন সরকারকে বাধ্য করতে চায় তাদের শর্ত মেনে নিতে। কিন্তু কিয়েভ এখনো তার অবস্থানে অনড়। জেলেনস্কি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আরও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন যাতে এ ধরনের হামলা মাঝ আকাশেই রুখে দেওয়া যায়।
ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে ড্রোন হামলার এই নতুন মাত্রা যুদ্ধের মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং এর বিধ্বংসী ক্ষমতা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে আগামী দিনগুলোতে এই সংকটের কী সমাধান আসে সেদিকে।
তীব্র ঠান্ডার এই দিনগুলোতে ইউক্রেনের মানুষ কেবল বিদ্যুতের জন্য নয়, বরং একটু মানবিক উষ্ণতা আর শান্তির আশায় দিন গুনছে। কিন্তু সীমান্তের ওপারে কামানের গর্জন আর আকাশে ড্রোনের আনাগোনা সেই আশাকে বারবার ফিকে করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া এই মানবিক বিপর্যয় রোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

