দক্ষিণ এশিয়ার ২০২৬ সালের নির্বাচনী মৌসুম শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের হাত ধরে। ১২ ফেব্রুয়ারির এই ভোট কেবল ঢাকার রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর রাজনৈতিক কম্পন অনুভূত হচ্ছে প্রতিবেশী ভারত ও নেপালে। আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো রুদাবেহ শহীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের এই নির্বাচন আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির এক বড় ‘লিঞ্চপিন’ বা কেন্দ্রবিন্দু।
আসন্ন মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে নেপালে সাধারণ নির্বাচন এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফল ও প্রক্রিয়া কীভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রভাব ফেলবে, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. নেপালের জন্য ‘সতর্কবার্তা’ ও তারুণ্যের প্রতিফলন
নেপালে আগামী ৫ মার্চ সাধারণ নির্বাচন। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মতো নেপালেও দুর্নীতিবিরোধী ও তারুণ্যনির্ভর একটি গণজাগরণ তৈরি হয়েছে।
একই ধাঁচের লড়াই: বাংলাদেশের ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এবং নেপালের ‘উজ্জ্বল নেপাল পার্টি’র মতো নতুন দলগুলো প্রথাগত অভিজাত রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করছে।
বর্জনের রাজনীতি বনাম অন্তর্ভুক্তি: বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের নির্বাচন এখনো অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক। অন্যদিকে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নেপালের জন্য একটি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে কাজ করতে পারে—যেখানে গণআন্দোলন পরবর্তী রূপান্তর বর্জন নয় বরং অংশগ্রহণের মাধ্যমে হওয়া উচিত।
২. পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’
ভারতের পূর্বদিকের দুই রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলাদেশ সবসময়ই একটি বড় ইস্যু।
পশ্চিমবঙ্গ: তৃণমূল কংগ্রেস যেখানে নিজেকে বিজেপির বিরুদ্ধে পূর্বাঞ্চলীয় দুর্গ হিসেবে দেখে, সেখানে বিজেপি ‘অনুপ্রবেশ’ ও ‘নাগরিকত্ব’ (CAA/NRC) ইস্যুকে সামনে রেখে ভোটারদের মেরুকরণ করতে চায়। বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনো অস্থিরতা বা সংখ্যালঘু ইস্যু সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী বক্তৃতায় প্রভাব ফেলবে।
আসাম: মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ বা জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে আসামের সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রশ্ন তুলছেন। বাংলাদেশের ভোটের গতিপ্রকৃতি আসামের সীমান্ত সুরক্ষা ও অভিবাসন বিরোধী বয়ানকে আরও শক্তিশালী করবে।
৩. ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ ও ভারতের কৌশলগত অবস্থান
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে একটি সংবেদনশীল ইস্যু।
সম্পর্ক রিসেট: ভারতের জন্য এই নির্বাচন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক ‘রিসেট’ করার বড় সুযোগ। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং নতুন সরকারের সাথে বোঝাপড়া ভারতের জন্য এক বড় পরীক্ষা।
আঞ্চলিক আধিপত্য: নেপাল এই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, ভারত কীভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ‘বিগ ব্রাদার’ ইমেজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
একনজরে আঞ্চলিক নির্বাচনের ক্যালেন্ডার ২০২৬
| দেশ/রাজ্য | নির্বাচনের তারিখ | মূল প্রভাবক ইস্যু |
| বাংলাদেশ | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | জেন জি বিপ্লব, অর্থনীতি, আওয়ামী লীগহীন ভোট। |
| নেপাল | ৫ মার্চ ২০২৬ | দুর্নীতি দমন, তরুণ নেতৃত্ব, প্রশাসনিক সংস্কার। |
| পশ্চিমবঙ্গ | মার্চ-মে ২০২৬ | অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ইস্যু। |
| আসাম | মার্চ-মে ২০২৬ | পরিচয় রক্ষা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, জনতাত্ত্বিক উদ্বেগ। |

