মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুদ্ধের দামামা বাজছে এবং ওয়াশিংটন-তেহরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক সুতার ওপর ঝুলছে, ঠিক তখনই পারস্য উপসাগরীয় জলসীমা থেকে দুটি বিদেশি তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দ করেছে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সকালে ইরানের উপকূলীয় এলাকা থেকে ১০ লাখ লিটারেরও বেশি জ্বালানিসহ জাহাজ দুটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় তেহরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি পাচারের একটি সুসংগঠিত চক্রকে রুখতে দীর্ঘ গোয়েন্দা নজরদারির পর এই অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানের সময় জাহাজ দুটিতে থাকা ১৫ জন বিদেশি নাবিককে আটক করে ইরানি বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
স্পর্শকাতর সময়ে হার্ডলাইন অবস্থান
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন কাল শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। একদিকে আলোচনার টেবিল, অন্যদিকে উপসাগরীয় জলসীমায় শক্তির মহড়া—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এখন চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওমানের আলোচনার আগে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতেই ইরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটে তেহরানের যে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা আরও একবার বিশ্বকে মনে করিয়ে দিল আইআরজিসি।
কেন এই অস্থিরতা?
গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরবর্তীতে নজিরবিহীন সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, এই আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানে অন্তত ৫ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখন ‘ডিফেন্সিভ’ থেকে ‘অফেন্সিভ’ মুডে রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নতুন করে পারমাণবিক চুক্তির শর্ত মেনে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ট্রাম্পের নির্দেশেই পারস্য উপসাগরে ইতিমধ্যে একটি মার্কিন নৌবহর (আ armada) মোতায়েন করা হয়েছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “খামেনির অত্যন্ত চিন্তিত হওয়া উচিত।” ঠিক এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই বিদেশি ট্যাঙ্কার জব্দের এই ঘটনা নতুন করে বারুদে অগ্নিসংযোগের শামিল।
পর্দার আড়ালে জ্বালানি যুদ্ধ
আইআরজিসির রিজিয়নাল কমান্ডার জেনারেল হায়দার হুনারিয়ান মুজাররাদ জানান, জব্দ করা ট্যাঙ্কারগুলোতে মূলত ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি তেল ছিল। ইরানের ভূখণ্ড থেকে কম দামে সংগৃহীত এই তেল বিদেশে উচ্চমূল্যে পাচারের জন্য একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক কয়েক মাস ধরে সক্রিয় ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ফার্সি দ্বীপের কাছ থেকে জাহাজ দুটিকে আটক করে বুশেহর বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তবে জব্দকৃত ট্যাঙ্কার দুটি কোন দেশের পতাকা বহন করছিল কিংবা আটক ১৫ জন নাবিক কোন দেশের নাগরিক, সে বিষয়ে তেহরান এখন পর্যন্ত মুখ খোলেনি। অতীতেও এমন ঘটনায় ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কান নাবিকদের আটকের নজির থাকায় এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।
সংঘাতের মুখে ওমান আলোচনা
বৃহস্পতিবারের এই ঘটনা এবং তার আগের দিন ইরানের মাটির নিচে নতুন একটি বিশালাকার মিসাইল ঘাঁটি উন্মোচন করা—সবই নির্দেশ করছে যে তেহরান কোনো ধরনের চাপের কাছে মাথা নত করতে রাজি নয়। কালকের ওমান আলোচনায় এই ট্যাঙ্কার জব্দের ইস্যুটি ছায়া ফেলবে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক গুঞ্জন চলছে।
পুরো বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ওমানের মাসকাটের দিকে। সেখান থেকে শান্তির কোনো বার্তা আসে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আরও দীর্ঘকালীন কালো মেঘে ঢেকে যায়, তা কেবল সময়ই বলতে পারবে।

