বিদেশের মাটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক যুগান্তকারী ও মানবিক ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি অভিজাত হোটেলে দলের নির্বাচনী ‘জনতার ইশতেহার’ প্রকাশকালে আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান অঙ্গীকার করেন যে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি বিদেশে মৃত্যুবরণ করলে রাষ্ট্রীয় খরচে এবং পূর্ণ মর্যাদার সাথে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের একটি বড় দাবি ছিল বিদেশে মৃত্যু হলে মরদেহ আনা নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আর্থিক সংকটের অবসান। ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে সেই আবেগ স্পর্শ করে বলেন, “প্রবাসীরা কেবল অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নন; তারা এই রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক। জীবিত অবস্থায় যেমন রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায় রয়েছে, তেমনি মৃত্যুর পরেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।”
মরদেহ ফেরাতে পরিবারকে আর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না
জামায়াত আমির প্রবাসীদের অমানবিক পরিবেশে কাজ করা এবং আকস্মিক মৃত্যুর রূঢ় বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “দুঃখজনক বাস্তবতা হলো— অনেক ক্ষেত্রে মরদেহ দেশে আনার সামর্থ্য পরিবারের থাকে না। ফলে বিদেশের মাটিতেই পড়ে থাকে আমাদের প্রিয় ভাই-বোনের লাশ। এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, জামায়াত সরকার গঠন করলে প্রবাসীর মরদেহ ফেরাতে পরিবারকে কোনো আর্থিক দুশ্চিন্তা বা দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। রাষ্ট্র নিজ উদ্যোগে বিমান ভাড়া থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচ বহন করবে এবং মরদেহের সাথে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন নিশ্চিত করবে।
প্রবাসীদের জন্য ‘সোশ্যাল রিভলভিং ফান্ড’ ও সুরক্ষা
কেবল মৃত্যুর পর নয়, প্রবাসীদের জীবিত অবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয় ইশতেহারে। ডা. শফিকুর রহমান জানান, প্রবাসীদের অবসরকালীন সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রবাসীদের যৌথ অংশগ্রহণে একটি ‘সোশ্যাল রিভলভিং ফান্ড’ গঠন করা হবে।
এই ফান্ডের লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমরা চাই না একজন প্রবাসী সারাজীবন দেশের জন্য শ্রম দিয়ে শেষ বয়সে এসে অসহায় হয়ে পড়ুক। এই ফান্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা দেশে ফিরে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবেন এবং যেকোনো অসুস্থতা বা দুর্দিনে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাবেন। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব নেবে— এটাই প্রকৃত ইনসাফ।”
পরিসংখ্যান নয়, প্রবাসীরাই দেশের গর্ব
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে ডা. শফিকুর রহমান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, প্রবাসীদের অবদানকে আমরা শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছি। অথচ তারা কেবল ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ নন, তারা এই দেশের গর্ব। প্রবাসীরা বিদেশে মারা গেলে তাদের পরিবার যে নিরাপত্তা হীনতায় ভোগে, সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রকে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর এই ‘জনতার ইশতেহার’ কোনো কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়। এটি একটি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা। যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে জীবনে যেমন সম্মান দেয় না, মৃত্যুতেও মর্যাদা দেয় না— সে রাষ্ট্র কখনো টেকসই হতে পারে না।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিভিন্ন প্রবাসী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রবাসীদের নিয়ে এই বিশেষ ঘোষণাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে, যা নির্বাচনী মাঠে জামায়াতের অবস্থানকে আরও সংহত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

