বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক বিশেষ সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। বুধবার বরিশালের ঐতিহাসিক বেলস পার্কে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী সমাবেশে তিনি দাবি করেন, দেশে এক নতুন ধরণের ‘জালেম’ শক্তির উদয় হয়েছে। যারা জনগণের সামনে এক নামে পরিচিত হলেও পর্দার আড়ালে তাদের ‘গুপ্ত’ পরিচয় ভিন্ন। সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও তার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু যে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের রাজনৈতিক কৌশল, তা উপস্থিত জনতার কাছে স্পষ্ট ছিল।
তারেক রহমান অভিযোগ করেন, এই বিশেষ গোষ্ঠীটি তাদের নিজস্ব ছাপাখানায় আগাম ব্যালট পেপার ছাপানোর মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। তার মতে, নির্বাচনের দিন এই জাল ব্যালট পকেটে করে নিয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে তারা। এটি কেবল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং দেশের সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের ওপর এক নতুন ধরনের আঘাত। ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে মানুষ যখন স্বৈরশাসনমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, তখন এই ধরনের তৎপরতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের দলীয় প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এই মঞ্চে তারেক রহমান বলেন, “আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি যে, স্বৈরাচার বিদায় নিলেও তাদের রেখে যাওয়া কুৎসিত রীতিগুলো এখনও রয়ে গেছে। যারা এখন জনগণের ওপর নতুন করে জুলুম করার পাঁয়তারা করছে, তাদের থেকে দেশের মানুষ ভালো কিছু আশা করতে পারে না।” বক্তৃতার প্রতিটি লাইনে ছিল এক ধরণের ধ্রুপদী রাজনৈতিক লড়াইয়ের ছাপ, যেখানে তিনি বারবার জনশক্তিকে সব ক্ষমতার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন।
নারী অধিকার ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান
সমাবেশে তারেক রহমানের বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল নারী সমাজের মর্যাদা। তিনি সাম্প্রতিক সময়ে এক রাজনৈতিক নেতার নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজের চাকা সচল রাখতে নারীরা পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে নারী শ্রমিকদের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, যারা মা-বোনদের নূন্যতম শ্রদ্ধা করতে জানে না, তারা আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার যোগ্যতা রাখে না।
বিএনপির এই শীর্ষ নেতা প্রতিশ্রুতি দেন যে, তাদের দল ক্ষমতায় এলে শহর ও গ্রামের কর্মজীবী নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সুবিধা চালু করা হবে। তিনি বেগম খালেদা জিয়ার আমলের অবৈতনিক নারী শিক্ষার কথা উল্লেখ করে বলেন, “নারীদের ঘরে বন্দি রেখে কোনো জাতির পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আমরা সেই অন্ধকার যুগে ফিরে যেতে চাই না।” তবে সমাবেশের ভিড়ে প্রচণ্ড গরমে ও হুড়োহুড়িতে কয়েকজন নারী অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা কিছুটা বিপত্তি ঘটায়, যাদের মধ্যে একজনকে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়।
রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি ও ‘গুপ্ত’ কৌশলের মোকাবিলা
তারেক রহমান কুমিল্লার এক নেতার সাম্প্রতিক মন্তব্য টেনে আনেন, যেখানে ১২ তারিখের পর জনগণকে দেখে নেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি একে এক ভয়াবহ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, “তাদের পরিকল্পনা হলো নির্বাচনের আগ পর্যন্ত জনগণের পা ধরা, আর নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণকে তাদের পায়ে পড়তে বাধ্য করা।” এর বিপরীতে তিনি তার কর্মীদের নির্দেশ দেন যাতে তারা বিজয়ী হওয়ার পর আগামী ৫ বছর জনগণের সেবক হয়ে তাদের পাশে থাকেন।
তিনি আরও বলেন, এই তথাকথিত ‘গুপ্ত’ গোষ্ঠীটি এর আগেও ১৯৭১ এবং ১৯৮৬ সালে সংকটকালে সুবিধাবাদী ভূমিকা পালন করেছে। তাদের এই দ্বিচারিতা দেশের মানুষের অজানা নয়। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের বিকাশ নম্বর এবং এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করার প্রক্রিয়াকে তিনি ভোট জালিয়াতির একটি নীল নকশা হিসেবে আখ্যা দেন। সৎ লোকের শাসনের স্লোগান দিয়ে যারা শুরুতেই অনৈতিক পথে পা বাড়ায়, তারা কখনো জনগণের জন্য কল্যাণকর কিছু করতে পারবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়নের রূপরেখা
নির্বাচনী ইশতেহারের আদলে তারেক রহমান বরিশালের মানুষের জন্য একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। তিনি ঘোষণা করেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রান্তিক কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হবে। এছাড়াও বরিশাল অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সমস্যা বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপনের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। যুবকদের কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন নার্স নিয়োগের বিষয়টিও তার পরিকল্পনায় স্থান পায়।
১২ই ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তারেক রহমানের এই ভাষণ তাতে নতুন মাত্রা যোগ করল। একদিকে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে বরিশাল সমাবেশটি কেবল একটি নির্বাচনী জনসভা নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাজনীতির এক কঠিন লড়াইয়ের পূর্বাভাস হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সমাবেশ শেষে বিশাল এক মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে তিনি এলাকা ত্যাগ করেন, রেখে যান একগুচ্ছ প্রশ্ন ও নতুন এক রাজনৈতিক সমীকরণ।

