বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট সরকারের সমীকরণে বন্দি থাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব, শ্রদ্ধা এবং জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য উইক (THE WEEK)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং ২০২৫ সালের শেষ দিকে বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর, বিএনপি এখন এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে।
নির্বাচন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, গত ১৫ বছর ধরে দেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। এবার সেই পরিস্থিতির অবসান হতে যাচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হলে জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও তিনি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন।
ভবিষ্যৎ সরকার গঠন প্রসঙ্গে ফখরুল একটি বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান, নির্বাচনে জয়ী হলে গত দেড় দশক ধরে যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে বিএনপির সঙ্গী ছিল, তাদের নিয়ে একটি ‘জাতীয় ঐক্যের সরকার’ গঠন করা হবে। তবে তিনি পরিষ্কার করে দেন যে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা নেই এবং তারা এই সরকারের অংশ হচ্ছে না।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি। মির্জা ফখরুল বলেন, “আমরা এমন এক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চাই যেখানে কেউ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।” এছাড়া বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের অবারিত অধিকার এবং এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। কৃষকদের ভাগ্য বদলে ‘ফার্মার কার্ড’ চালুর মাধ্যমে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল সরাসরি বলেন, দিল্লির উচিত শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক মূল্যায়ন না করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পালস বোঝা। তিনি সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ, তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা দূর করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও দুই দেশের সম্পর্ক আরও ইতিবাচক উচ্চতায় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে সংঘটিত গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে অবশ্যই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। তবে আঞ্চলিক শান্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সঙ্গেই গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে মত দেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি সংস্কারমুখী ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ছবি এঁকেছেন। তার কথায় ফুটে উঠেছে এমন এক আগামীর বার্তা, যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফিরবে ভারসাম্য এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।

