জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে নারী কর্মীদের ওপর ক্রমবর্ধমান হামলা এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা উইং। দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা বাধা প্রদর্শন করে নারী ভোটারদের দমানো যাবে না। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছেন তারা।
রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের একটি প্রতিনিধি দল। সাক্ষাৎ শেষে তারা কমিশনের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি জমা দেন, যেখানে সারা দেশে নারীদের ওপর হওয়া সাম্প্রতিক ১৫টি হামলার সচিত্র প্রমাণ সংযুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি জেনারেল নেসা সিদ্দিকা, সহকারী সেক্রেটারি সাইদা রহমান এবং রাজনৈতিক বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেত্রী ডা. হাবিবা চৌধুরী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডা. হাবিবা চৌধুরী বলেন, দেশের মোট ভোটারের অর্ধেকই নারী। অথচ গত দেড় দশকে দেশের মা-বোনেরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এবার সেই সুযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্য একটি বিশেষ মহল গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডা. হাবিবা বলেন, “আমাদের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। নারীরা অবলা নয়, আমরা সাহসী। যেখানেই বাধা আসবে, সেখানেই ইনশাআল্লাহ প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।” তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্বের সাথে জানানো হয়েছে।
নির্বাচনী মাঠে সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ করেন জামায়াত নেত্রীরা। শরীফ ওসমান হাদি ও রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে তারা বলেন, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করলে আসন্ন নির্বাচন জনমনে বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
সংগঠনের আদর্শ ও নারী নেতৃত্ব প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নেসা সিদ্দিকা বলেন, জামায়াতে ইসলামী একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবনবিধানে বিশ্বাসী সংগঠন। তারা কোরআনের বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হন। তিনি উল্লেখ করেন, ইসলামে পুরুষকে নারীর পরিচালক করা হয়েছে, তাই দলের সর্বোচ্চ শীর্ষ পদে (আমির) নারী আসা তাদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়।
নেসা সিদ্দিকা আরও বলেন, “গত ৫৪ বছরে দেশে দুজন নারী প্রধানমন্ত্রী শাসন করেছেন, কিন্তু নারীদের নিরাপত্তা কি আসলেও বেড়েছে? আমাদের মূল লক্ষ্য হলো নারীর প্রকৃত অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমরা এমন নেতৃত্ব চাই যারা মানবিক হবে।” তিনি তথ্য দেন যে, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে শুরার উপদেষ্টা কমিটিতে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি রয়েছেন এবং স্থানীয় নির্বাচনেও নারীদের অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বাড়ছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে সম্প্রতি তোলা বিভিন্ন অভিযোগকে ‘আজগুবি’ এবং ‘ভীতু মানসিকতার লক্ষণ’ বলে আখ্যায়িত করেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। তাদের দাবি, জামায়াতের প্রতি জনগণের অভূতপূর্ব গণজোয়ার দেখে একটি পক্ষ অস্থির হয়ে অবান্তর কথাবার্তা বলছে। তারা মনে করেন, জনগণের সমর্থনই তাদের রাজনীতির মূল শক্তি।
স্মারকলিপি গ্রহণের পর নির্বাচন কমিশনাররা অভিযোগগুলো অত্যন্ত ধৈর্য ও গুরুত্বের সাথে শুনেছেন বলে জানান প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। ডা. হাবিবা চৌধুরী বলেন, “কমিশন আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে তারা বিষয়গুলো ইতিবাচকভাবে দেখবেন এবং নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।”
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। জামায়াতের এই কঠোর অবস্থান এবং প্রতিরোধের ডাক মাঠপর্যায়ে নারী কর্মীদের মনোবল বাড়ালেও, সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন তাদের দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী একটি সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে কি না।

