ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কঠোর জবাব দিতে এবার সরাসরি পালটা ব্যবস্থা গ্রহণ করল তেহরান। ইউরোপের দেশগুলোর সামরিক বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। রোববার দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার এই বিতর্কিত ও প্রভাবশালী সিদ্ধান্তের কথা জনসমক্ষে জানান। দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এখন এক নতুন এবং বিপজ্জনক মোড় নিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
রোববার দুপুরে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই ঘোষণা দেওয়ার সময় একটি প্রতীকী বার্তাও দেন। তাকে এদিন ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি-র (IRGC) সামরিক পোশাকে দেখা যায়। টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে জানান, ইউরোপীয় দেশগুলোর সেনাবাহিনী এখন থেকে ইরানের কাছে কোনো সাধারণ সামরিক বাহিনী নয়, বরং সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হবে।
গালিবাফ বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ আইনের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, এটি মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেওয়া আগের একটি সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রতিক্রিয়া। গত সপ্তাহে ইইউ ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তেহরান মনে করছে, ইউরোপের এই পদক্ষেপ ছিল উস্কানিমূলক এবং আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
ইরানের ভেতরে গত কয়েক মাস ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে বিপ্লবী গার্ডের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে আসছিল পশ্চিমা বিশ্ব। বিক্ষোভকারীদের ওপর আইআরজিসি-র শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি ইইউ-র সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে। গত মাসে বিক্ষোভ চলাকালে সহিংসতার জেরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতীকীভাবে হলেও বিপ্লবী গার্ডকে কালো তালিকাভুক্ত করে। তবে ইরান একে নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছে।
পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে স্পিকার গালিবাফ ইউরোপের নেতাদের দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি মন্তব্য করেন, বিপ্লবী গার্ডের ওপর আঘাত হানতে গিয়ে ইউরোপীয়রা মূলত নিজেদের পায়েই নিজেরা কুড়াল মেরেছে। তার মতে, ইউরোপের দেশগুলো অন্ধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করছে। গালিবাফের দাবি, এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ইউরোপীয় সরকারগুলো তাদের নিজেদের জনগণের স্বার্থকেও বিসর্জন দিয়েছে।
এই ঘোষণার ফলে এখন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা ইরানের মাটিতে আর নিরাপদ থাকবে না বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। গালিবাফ জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থাকে ইরান থেকে বহিষ্কার করার বিষয়ে পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ইউরোপীয় কূটনীতিক বা সামরিক পর্যবেক্ষকদের অবস্থান এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি ইরানের সাধারণ সেনাবাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর রাজতন্ত্রের পতন ঘটলে এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল। মূলত বিপ্লবকে রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল এদের প্রধান কাজ। তবে সময়ের সাথে সাথে ইরানের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতিতেও এদের একক আধিপত্য তৈরি হয়েছে।
বিপ্লবী গার্ড কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং এটি ইরানের আধুনিক মিসাইল প্রযুক্তি এবং পারমাণবিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান তত্ত্বাবধায়ক। ফলে এই বাহিনীকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করা মানে সরাসরি ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি বড় অংশকে আক্রমণ করা। তেহরান মনে করছে, ইউরোপীয়রা যে পথে হাঁটছে তাতে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে এবং পশ্চিমা বিশ্বের জন্য তা বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে।
তেহরানের এই কড়া অবস্থানের পর এখন সবার নজর ব্রাসেলসের দিকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নতুন হুমকির মুখে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে নাকি আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটবে, তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এবং ইউরোপের মধ্যে এই পালটাপালটি সন্ত্রাসী তকমা কেবল কূটনৈতিক যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়তে পারে তেল সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তাতেও।
সাম্প্রতিক সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং ইরানের ওপর বাড়তি চাপের খবরের মধ্যেই এই ঘোষণা তেহরানের পক্ষ থেকে একটি শক্ত বার্তার মতো কাজ করছে। ইরান বারবার বলছে যে তারা কোনো যুদ্ধের উস্কানি দেবে না, তবে আক্রান্ত হলে তারা সর্বশক্তি দিয়ে জবাব দিতে প্রস্তুত। গালিবাফের পরনে আইআরজিসি-র ইউনিফর্ম ছিল সেই প্রতিরোধেরই একটি দৃশ্যমান প্রতীক।
বর্তমানে ইরান-ইউরোপ সম্পর্ক যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তা স্পষ্ট। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী তকমা দেওয়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আইনে খুব একটা কার্যকর না হলেও, কূটনৈতিকভাবে এটি ইরানের একচ্ছত্র বিরোধী অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। এই পরিস্থিতির ফলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়ল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত ইরান এই আইন কীভাবে কার্যকর করে এবং ইউরোপের কোনো সামরিক সদস্যকে তারা গ্রেফতার বা বহিষ্কার করে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা নিশ্চিত যে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নতুন করে সংঘাতের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। তেহরান এবং ইউরোপের এই রেষারেষি বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

