দীর্ঘ টানাপোড়েন আর কূটনৈতিক অস্থিরতার মাঝে একটি নাটকীয় মোড় নিল ওয়াশিংটন ও কারাকাসের সম্পর্ক। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে জব্দ করা একটি বিশালাকার তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ ভেনেজুয়েলাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। দুইজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন চাপ বাড়াতে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড। এই ধারাবাহিকতায় এ পর্যন্ত দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির মোট সাতটি বিশাল জ্বালানি ট্যাংকার জব্দ করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছিল জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে, যখন এম/টি সোফিয়া নামক একটি সুপারট্যাংকার মার্কিন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এম/টি সোফিয়া জাহাজটির মূল মালিকানা পানামার হাতে থাকলেও সেটি দীর্ঘদিন ধরে লিজ নিয়ে ব্যবহার করছিল ভেনেজুয়েলা। বিশাল এই জলযানটি আটকের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এবার সেই জাহাজটিই ভেনেজুয়েলার কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাইডেন-ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী এই বিশেষ পরিস্থিতি। তবে এর পেছনে কোনো পর্দার আড়ালে সমঝোতা চলছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
রয়টার্সের পক্ষ থেকে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে এই প্রত্যাবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে বাকি ছয়টি ট্যাংকার জাহাজের ভবিষ্যৎ কী এবং কেন হঠাৎ এই নমনীয়তা দেখানো হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা মুখ খুলতে রাজি হননি। মার্কিন কোস্টগার্ড বাহিনীর মুখপাত্ররাও এই স্পর্শকাতর ইস্যুতে আপাতত কোনো মন্তব্য করতে নারাজ।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন চরম অস্থিতিশীল। দেশটির সরকারি তথ্য সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ও এই ইস্যুতে রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। কারাকাসের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না আসায় বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা জল্পনা ডালপালা মেলছে।
ভেনেজুয়েলার এই সংকটের মূলে রয়েছে গত ৩ জানুয়ারির সেই রুদ্ধশ্বাস রাত। রাজধানী কারাকাসে এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী অনেকটা অপহরণ স্টাইলে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। বর্তমানে তারা নিউইয়র্ক সিটির একটি ফেডারেল কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে বন্দি করার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘোষণায় জানিয়েছিলেন, এখন থেকে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের। ট্রাম্পের সেই ঘোষণার মাত্র তিন দিন পর, ৭ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে ‘এম/টি সোফিয়া’ জব্দ করা হয়েছিল। আটকের সময় জাহাজটি অপরিশোধিত তেলে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল।
এখন প্রশ্ন উঠছে, জাহাজটি ফেরত দেওয়া হলেও এর ভেতরে থাকা কোটি কোটি ডলার মূল্যের তেলও কি ফেরত দেওয়া হবে? মার্কিন কর্মকর্তারা এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মাদুরো পরবর্তী ভেনেজুয়েলায় মার্কিন নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার কৌশল হিসেবেই হয়তো এই সীমিত ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মাদুরোর অনুপস্থিতি এবং মার্কিন বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপ দেশটিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এম/টি সোফিয়া ফিরে পাওয়া কারাকাসের জন্য কিছুটা স্বস্তির হলেও, সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি কোনো বড় পরিবর্তন আনবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ কি মাদুরো প্রশাসনের সাথে কোনো গোপন চুক্তির ইঙ্গিত, নাকি এটি কেবলই একটি লিজ নেওয়া জাহাজের আইনি জটিলতা এড়ানোর চেষ্টা—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা গভীর পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছেন। বর্তমানে নিউইয়র্কের কারাগারে বন্দি মাদুরোর ভাগ্যের সাথে এই জাহাজের ফেরা কোনোভাবে সম্পৃক্ত কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি।

