নির্বাচনী প্রচারণায় একের পর এক হামলার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকার রাজনৈতিক মাঠ। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের প্রার্থীদের ওপর কোনো ধরণের হামলা আর সহ্য করা হবে না। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর ফকিরাপুলে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, “যদি আমাদের প্রার্থীদের ওপর আঘাত আসে, তবে এখন থেকে পাল্টা আঘাত দেওয়া হবে।”
ঢাকা-৮ আসনের এনসিপি প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর সাম্প্রতিক হামলার প্রতিবাদে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজে এক আমন্ত্রণে অংশ নিতে গেলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে বাধা দেওয়া হয় এবং তার ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এই ঘটনাকে তিনি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে অভিহিত করেন।
নাহিদ ইসলাম কেবল ঢাকা-৮ নয়, বরং দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত কয়েক দিনে দেশের প্রায় সাতটি জেলায় জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের ওপরও হামলা চালানো হয়েছে। একইসঙ্গে ঢাকা-১৮ আসনের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদিবের ওপর হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠী মাঠ দখলের নোংরা খেলায় মেতেছে।
নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাহিদ বলেন, “প্রশাসন ও ইসি যদি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তবে আমরা আমাদের নিজেদের সুরক্ষায় যা করা প্রয়োজন, তা-ই করব।” তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, এক দলের প্রার্থীর ওপর ডিম ছুড়লে অন্য দলের প্রার্থীর ওপরও ডিম পড়বে—এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়, তবে বাধ্য হলে পিছু হটবে না এনসিপি।
বিএনপির প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করে নাহিদ ইসলাম কড়া সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আপনারা যদি আওয়ামী লীগের মতো সন্ত্রাসী কায়দায় প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরাতে চান, তবে তাদের সাথে আপনাদের পার্থক্য কোথায়?” তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়ার আশায় মঞ্চে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে, যা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।
তিনি বিএনপিকে অতীতের ব্যর্থতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তারা মাঠে নামতে পারেনি এবং ২৮ অক্টোবরের আন্দোলনেও স্থায়িত্ব ছিল নামমাত্র। সেই সময় জনগণ তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখালেও এখন তারা সমালোচনা সহ্য করতে পারছে না বলে মন্তব্য করেন নাহিদ। তিনি বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালটের মাধ্যমে জনগণই বিচার করবে—কে বেয়াদব আর কে গ্যাংস্টার।”
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজের ওপর ঘটা বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। তিনি দাবি করেন, পুলিশের উপস্থিতিতেই তার কর্মীদের ওপর কিল-ঘুষি ও লাথি চালানো হয়েছে। এমনকি তাদের নারী সদস্যদের ওপর বরফ নিক্ষেপ করা হয়েছে, যার ফলে এক কর্মীর মাথায় চারটি সেলাই দিতে হয়েছে।
এই হামলার নেপথ্যে তিনি বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ভাগনে আদিত্যের নাম উল্লেখ করেন। নাসীরুদ্দীন অভিযোগ করেন, আদিত্যের সরাসরি নির্দেশনায় এবং ছাত্রদলের সাবেক কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে এই হামলা চালানো হয়েছে। ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ তোলেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ইসি একটি নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ করছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না দিয়ে প্রার্থীদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দিয়ে ইসি দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে নাহিদ ইসলাম পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে কোনো ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া হবে না। তিনি ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রশাসনকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার শেষ সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন।

