আমেরিকার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর বড় ধরণের শুল্ক ধাক্কা দিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের তোয়াক্কা না করে দেশটি থেকে আসা আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়ে সরাসরি ২৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই মারমুখী সিদ্ধান্তের কথা জানান।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান রপ্তানি পণ্য যেমন—অটোমোবাইল বা যানবাহন, কাঠ, ঔষধ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রীর ওপর বাড়তি শুল্ক অবিলম্বে কার্যকর হতে যাচ্ছে। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে সাফ জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত কেবল হুট করে নেওয়া নয়, বরং দক্ষিণ কোরিয়ার আইনসভার ‘অসহযোগিতার’ পাল্টা জবাব।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে ট্রাম্প বলেন, গত বছরের ৩০ জুলাই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি-এর সঙ্গে তাঁর একটি ‘ঐতিহাসিক’ বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। অক্টোবর মাসে তাঁর কোরিয়া সফরের সময়ও চুক্তিটির শর্তাবলী পুনরায় নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার সংসদ বা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সেই চুক্তি অনুমোদনে গড়িমসি করছে। ট্রাম্পের ভাষায়, “চুক্তি কার্যকর করা তাদের অধিকার হতে পারে, কিন্তু মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় শুল্ক বাড়ানোও আমার সিদ্ধান্ত।”
তবে এই শুল্ক যুদ্ধের একটি অদ্ভুত দিক হলো—যদিও সামগ্রিকভাবে শুল্কের হার বেড়েছে, তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ির ওপর ২৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ছিল, যা নতুন ঘোষণায় ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তবুও সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে এবং সিউলকে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি (প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার) পূরণে বাধ্য করতে ট্রাম্প এই ‘চাপের রাজনীতি’ প্রয়োগ করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৩২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে হুন্দাই বা কিয়া-র মতো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরণের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স খাতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব মার্কিন বাজারের ভোক্তাদের পকেটেও টান দেবে।
সিউল থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস বা ব্লু হাউস এখনো এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী কিম জুং-কোয়ান জরুরি ভিত্তিতে ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। মিত্রদেশের ওপর এমন আকস্মিক শুল্ক আরোপ এশিয়ায় আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কেবল দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেই নয়, বরং কানাডা ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর তাঁর সাম্প্রতিক শুল্ক হুমকির ধারাবাহিকতা মাত্র। বাণিজ্যকে হাতিয়ার করে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নে ট্রাম্প যে কতটা কঠোর হতে পারেন, এই ঘটনা আবারও তার প্রমাণ দিল।

