বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্যের হাহাকার দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন, যা গত ৩০ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই হলো সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পরিবারগুলো।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে কাজ করা প্রভাবশালী সংস্থা ‘জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশন’ (জেআরএফ) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্রিটেনে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমলেও ‘অতিদরিদ্র’ বা যারা দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তাঁদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
ব্রিটেনের মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি পরিবারের বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পর হাতে থাকা অর্থ যদি জাতীয় গড় আয়ের তুলনায় অনেক কম হয়, তবে তাদের ‘অতিদরিদ্র’ হিসেবে গণ্য করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, দুই সন্তান বিশিষ্ট একটি পরিবারের বার্ষিক আয় যদি ১৬ হাজার ৪০০ পাউন্ডের নিচে থাকে, তবে তারা এই স্তরে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সিংহভাগ বাংলাদেশি পরিবারের আয় এই নির্দিষ্ট সীমার নিচেই রয়ে গেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৪-৯৫ সালে ব্রিটেনে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ শতাংশ, যা বর্তমানে ২১ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, অতিদরিদ্র মানুষের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, ধনীর সংখ্যা বাড়লেও দরিদ্ররা আরও বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শিশু দারিদ্র্য। বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ শিশু চরম অভাবের মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে। গত তিন বছর ধরে এই সংখ্যাটি ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার একটি বিতর্কিত নিয়ম চালু করেছিল যে, নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে দুই সন্তানের বেশি সন্তান থাকলে তারা বাড়তি সামাজিক সুরক্ষা ভাতা পাবে না। যদিও বর্তমান অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস গত এপ্রিলে এই নিয়ম বাতিল করেছেন, তবে জেআরএফ সতর্ক করেছে যে কেবল এই একটি পদক্ষেপ শিশু দারিদ্র্য কমাতে যথেষ্ট নয়।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা এবং শারীরিক প্রতিবন্ধীরা। তবে জাতিগত দিক থেকে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিরা অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে। এর পেছনে ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং বড় পরিবারের ব্যয়ভার বহন করার মতো চ্যালেঞ্জগুলোকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত রাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে সাধারণ প্রবাসীদের টিকে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ব্রিটিশ সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুফল প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠী পর্যন্ত কতটুকু পৌঁছাবে, তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

