ভারতের সামরিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন কর্নেল সোফিয়া কুরেশি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সাড়া জাগানো সেনা অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন এবং দীর্ঘ সামরিক ক্যারিয়ারে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবার তাকে ‘বিশিষ্ট সেবা পদক’ (VSM)-এ ভূষিত করছে ভারত সরকার। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের বিশেষ কুচকাওয়াজ ও উদযাপন অনুষ্ঠানে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে।
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান গৃহীত হওয়ার এই ঐতিহাসিক দিনটিতে প্রতি বছরই সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে বীরত্বগাথা পারফরম্যান্সের জন্য পদক ঘোষণা করা হয়। এ বছর কর্নেল সোফিয়া কুরেশিসহ মোট ১৩৫ জনকে বিশিষ্ট সেবা পদক দেওয়া হচ্ছে। তবে সোফিয়ার নামটি আলাদা করে আলোচনায় আসার মূল কারণ গত বছরের সেই ‘অপারেশন সিঁদুর’। জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতের সেই প্রত্যাঘাতের খুঁটিনাটি বিশ্ববাসীর সামনে সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছিলেন তিনি।
গত বছরের সেই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে সামরিক পোশাক পরিহিত সোফিয়া যখন ভারতের রণকৌশল ব্যাখ্যা করছিলেন, তখন সেটি কেবল একটি সেনা ব্রিফিং ছিল না—বরং তা ছিল ভারতের ক্রমবর্ধমান নারীশক্তির এক বলিষ্ঠ বার্তা। উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংহের পাশে দাঁড়িয়ে তার সেই দৃঢ়চেতা কণ্ঠস্বর তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। অনেকের মতে, সেনাবাহিনীর অপারেশনাল বিষয়ে নারীদের সম্পৃক্ততা যে কতটা গভীরে, তা প্রমাণ করতেই সোফিয়াকে সেই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
৫২ বছর বয়সী এই চৌকস কর্মকর্তার জন্ম ১৯৭৪ সালে গুজরাটের বদোদরায়। ১৯৯৭ সালে বায়োকেমিস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি যোগ দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিগন্যাল কোরে। বর্তমানে তিনি সামরিক যোগাযোগ ও ইলেকট্রনিক্স অভিযান সহায়ক শাখার অন্যতম শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে কর্নেল সোফিয়ার রেকর্ডে এটিই প্রথম মাইলফলক নয়। ২০১৬ সালে তিনি প্রথম নারী কর্মকর্তা হিসেবে ১৮টি দেশের সম্মিলিত সামরিক মহড়ায় ভারতের নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন। পুণেতে আয়োজিত সেই মহড়ায় জাপান, চীন, আমেরিকা ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো অংশ নিয়েছিল।
কর্নেল সোফিয়ার বীরত্ব কেবল রণক্ষেত্রে বা মহড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, ভারতের বিচার বিভাগেও তার নাম সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নারীদের ‘স্থায়ী কমিশন’ বা পার্মানেন্ট কমিশন প্রদানের ঐতিহাসিক মামলার শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট সোফিয়ার উদাহরণ টেনেছিল। ২০০৬ সালে কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে তার অসাধারণ সাফল্যের কথা উল্লেখ করে আদালত জানিয়েছিলেন, লিঙ্গভেদে নয় বরং যোগ্যতার ভিত্তিতেই নারীদের শীর্ষপদে সুযোগ দেওয়া উচিত।
প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে প্রকাশিত তালিকায় আরও অনেক বীর সেনানির নাম উঠে এসেছে। এ বছর ৩০ জনকে পরম বিশিষ্ট সেবা পদক, চার জনকে উত্তম যুদ্ধ সেবা পদক এবং ৫৬ জনকে অতি বিশিষ্ট সেবা পদকে ভূষিত করা হচ্ছে। এছাড়া নৌসেনা ও বায়ুসেনার ৪৩ জন সদস্যকেও বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পদক দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষ এই তালিকায় সোফিয়া কুরেশির নাম থাকাটা দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভূ-রাজনীতিতে এক ভিন্নধর্মী গুরুত্ব বহন করছে।
প্রজাতন্ত্র দিবসের এই প্রভাতে যখন দিল্লির রাজপথে কুচকাওয়াজ চলবে, তখন কর্নেল সোফিয়া কুরেশির এই স্বীকৃতি ভারতের তরুণ প্রজন্মের নারীদের সামরিক পেশায় যোগ দিতে আরও অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা। কর্মদক্ষতা, নেতৃত্ব আর সাহসিকতা—এই তিনের সংমিশ্রণে সোফিয়া কুরেশি আজ ভারতের জাতীয় বীরদের তালিকায় নতুন এক নাম।

