আধুনিক যুগে যখন স্বার্থ আর যান্ত্রিকতা অনেক সময় সম্পর্কের গভীরতাকে ম্লান করে দেয়, তখন ভারতের ওডিশা রাজ্যে জন্ম নিল ভালোবাসার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। আর্থিক দৈন্যদশা যার গতিরোধ করতে পারেনি, আর বার্ধক্য যার ইচ্ছাশক্তিকে দমাতে পারেনি। তিনি ৭৫ বছর বয়সী বাবু লোহার। পক্ষাঘাতগ্রস্ত ৭০ বছর বয়সী স্ত্রী জ্যোতির প্রাণ বাঁচাতে নিজেই ভ্যান চালিয়ে পাড়ি দিলেন প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ।
ওডিশার সম্বলপুর জেলার মোদিপাড়া গ্রামের এই দম্পতির জীবনযুদ্ধের গল্পটি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এনডিটিভির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃদ্ধা জ্যোতি হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে সম্বলপুরের স্থানীয় চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কটকের এসসিবি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু অর্থাভাবে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করার সামর্থ্য ছিল না এই নিঃস্ব দম্পতির।
অসহায় হয়ে বসে না থেকে বাবু লোহার তার নিজের পুরনো মালবাহী ভ্যানটিকেই রূপান্তর করেন অস্থায়ী এক অ্যাম্বুলেন্সে। স্ত্রীর দীর্ঘ পথ চলার কষ্ট লাঘব করতে ভ্যানের ওপর বিছিয়ে দেন জরাজীর্ণ এক তোষক। এরপরই শুরু হয় এক অনিশ্চিত যাত্রা। সম্বলপুর থেকে কটক—এই দীর্ঘ ৩০০ কিলোমিটার পথ ভ্যানে করে পাড়ি দিতে বাবু লোহারের সময় লেগেছে দীর্ঘ ৯ দিন।
দিনের আলোয় তপ্ত রোদে ঘাম ঝরিয়ে ভ্যান চালিয়েছেন তিনি, আর রাত হলে কোনো রাস্তার ধারের দোকানের বারান্দায় বা গাছের নিচে চলত তাদের বিশ্রামের পালা। বৃদ্ধ বয়সে এই অমানুষিক পরিশ্রম কেবল স্ত্রীর প্রতি অগাধ ভালোবাসার জোরেই সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কটক পৌঁছানোর পর জ্যোতি টানা দুই মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
সুস্থ হওয়ার পর গত ১৯ জানুয়ারি তারা যখন ভ্যানে করেই বাড়ি ফিরছিলেন, তখন আবারও বিপত্তি ঘটে। চৌদ্বার এলাকায় একটি দ্রুতগামী গাড়ির ধাক্কায় তাদের একমাত্র ভরসা সেই ভ্যানটি দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে জ্যোতি নতুন করে আহত হলে তাদের কাছের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়।
সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. বিকাশ বাবু লোহারের এই আত্মত্যাগের গল্প শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি জ্যোতির সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন, যাতে এই বৃদ্ধ দম্পতি নিরাপদে নিজেদের গ্রামে ফিরতে পারেন।
সব বাধা অতিক্রম করে যাত্রা শুরুর প্রস্তুতিকালে বাবু লোহার একটি কথাই বারবার বলছিলেন— “আমাদের এই দুনিয়ায় আর কেউ নেই। আমরা দুজনই একে অপরের শেষ ভরসা।” স্ত্রীর প্রতি তার এই নিঃস্বার্থ টান কেবল একটি পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং বর্তমান সময়ের কঠিন বাস্তবতায় মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওডিশার এই ‘লাভ স্টোরি’ এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরছে, যা প্রমাণ করে যে প্রকৃত ভালোবাসার কাছে দূরত্ব বা বয়স কোনো বাধাই নয়।

