জাপানের প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর দীর্ঘ এক যুগের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) যখন বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া’ পুনরায় চালু করা হলো, তখন সারা বিশ্বের নজর ছিল উদীয়মান সূর্যের দেশের দিকে। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক ঘণ্টা। চালুর একদিন পার হতে না হতেই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফের অচল হয়ে পড়েছে এই বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।
রাজধানী টোকিও থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে নিগাতা প্রদেশে অবস্থিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৪২০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। মোট সাতটি পরমাণু চুল্লিসমৃদ্ধ এই কেন্দ্রটির সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ৮.২ গিগাওয়াট। তবে বুধবার কেবল ৬ নম্বর চুল্লিটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) ভোরেই সেই চুল্লিতে দেখা দেয় বড় ধরনের বিপত্তি।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালনাকারী সংস্থা টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো) জানিয়েছে, চুল্লির কার্যক্রম শুরু করার মাত্র ৫ ঘণ্টা ২৫ মিনিটের মাথায় ‘কন্ট্রোল রড’ (Control Rod) সরানোর সময় একটি স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম বেজে ওঠে। নিউক্লিয়ার ফিশন বা পারমাণবিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই রডগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অ্যালার্মটি সঙ্কেত দিলে নিরাপত্তার স্বার্থে তৎক্ষণাৎ পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
টেপকোর সাইট সুপারিনটেনডেন্ট তাকেইউকি ইনাগাকি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, “চুল্লির ভেতর যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং এটি কোনো ছোটখাটো ত্রুটি নয়। এই মুহূর্তে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু রাখা মানেই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়া।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এই ত্রুটি সারানো বেশ সময়সাপেক্ষ এবং এখনই বলা সম্ভব নয় যে কবে নাগাদ পুনরায় উৎপাদন শুরু করা যাবে।
২০১১ সালের সেই প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ও সুনামির পর ফুকুশিমা বিপর্যয়ের জেরে জাপানের ৫৪টি পরমাণু চুল্লি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কেন্দ্রটিও তখন থেকেই অচল ছিল। দীর্ঘ ১৪ বছর পর একে আবার সচল করা হয়েছিল জাপানের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য পূরণে।
তবে এই পুনরুত্থান মোটেই সহজ ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘ দিন ধরে এই কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিরোধিতা করে আসছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত এই কেন্দ্রটি যে কোনো সময় দ্বিতীয় একটি ‘ফুকুশিমা ট্র্যাজেডি’র জন্ম দিতে পারে। চালুর একদিন পরই এমন অচল অবস্থা সেই আশঙ্কার আগুনে যেন আরও ঘি ঢেলে দিল।
টেপকো কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেছে যে, বর্তমানে চুল্লিটি স্থিতিশীল অবস্থায় আছে এবং প্রকৃতিতে কোনো ধরনের তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নেই। তবে বিশ্বের বৃহত্তম এই কেন্দ্রের এমন আকস্মিক বিকল হয়ে যাওয়া জাপানের জ্বালানি নীতির জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, কারিগরি পরীক্ষা শেষে কত দ্রুত এই ‘নিউক্লিয়ার জায়ান্ট’ আবার তার পূর্ণ শক্তিতে ফিরতে পারে।

