আজ ২৩ জানুয়ারি। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি আর দশটি দিনের মতো মনে হলেও, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের জন্য এটি একটি স্মরণীয় ক্ষণ। ১৯৪২ সালের এই দিনে কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মেছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি পরবর্তীকালে একটি স্বাধীন দেশের চলচ্চিত্রের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন। তিনি আব্দুর রাজ্জাক— আমাদের সবার প্রিয় ‘নায়করাজ’।
বেঁচে থাকলে আজ তিনি ৮৪ বছরে পা দিতেন। ২০১৭ সালের আগস্টে মায়ার বাঁধন কাটিয়ে ওপাড়ে পাড়ি জমালেও, এ দেশের মানুষের হৃদয়ে তার সিংহাসন আজও অটুট। কিন্তু যে নায়করাজকে আমরা রাজকীয় ভঙ্গিতে পর্দায় দেখে অভ্যস্ত, তার শুরুর দিনগুলো ছিল চরম দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা। পর্দার হিরো হওয়ার আগে তাকে বাস্তবের কঠিন এক হিরো হতে হয়েছিল।
১৯৬৪ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা ভাবলে আজও অবাক হতে হয়। একদিকে কলকাতায় তখন উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়দের স্বর্ণযুগ, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা। এক শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শে জীবন বাঁচাতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে শরণার্থী হিসেবে ঢাকায় চলে আসেন রাজ্জাক। সাথে ছিল না কোনো সম্পদ, ছিল কেবল এক বুক স্বপ্ন আর অভিনয় করার অদম্য জেদ।
ঢাকার ব্যস্ত ফার্মগেট এলাকায় একটি ছোট ভাড়া বাসায় শুরু হয় তার নতুন লড়াই। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের টেলিভিশন নাটকই ছিল তখন তার আয়ের একমাত্র উৎস। এক পুরোনো সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক নিজেই শুনিয়েছিলেন সেই সংগ্রামের গল্প। তিনি জানিয়েছিলেন, সপ্তাহে মাত্র ৬৫ টাকা আয়ের বিনিময়ে নাটকে অভিনয় করতেন তিনি। সেই সামান্য কটা টাকা দিয়েই দুই সন্তান আর স্ত্রীর আহার ও মাথার ওপর ছাদ জোগাতে হতো তাকে।
সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে রাজ্জাক বলেছিলেন, “এখনকার ছেলেমেয়েরা শুনলে হয়তো বিশ্বাসই করতে চাইবে না, কিন্তু ওই ৬৫ টাকাই ছিল আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন। খুব কষ্টে কেটেছে সেই সময়গুলো।” অভাব থাকলেও তিনি কখনো অভিনয় ছেড়ে অন্য কিছু করার কথা ভাবেননি। কিশোর বয়সে মঞ্চনাটক দিয়ে যার হাতেখড়ি, তার রক্তে মিশে ছিল কেবলই পারফর্মিং আর্ট।
রাজ্জাকের ভাগ্য বদলে যায় জহির রায়হানের হাত ধরে। ‘বেহুলা’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার পর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। লখিন্দর চরিত্রে তার সেই সহজ-সরল অভিনয় মানুষকে মুগ্ধ করে। এরপর একে একে ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘রংবাজ’ কিংবা ‘অবুঝ মন’-এর মতো কালজয়ী সিনেমা দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির ড্রইংরুমের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নায়করাজ কেবল একজন অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের একটি প্রতিষ্ঠান। অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অগণিত সম্মাননা। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। আজ তার জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্ত আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের শ্রদ্ধায় সিক্ত হচ্ছেন এই মহান শিল্পী।
বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে নক্ষত্র অনেক থাকলেও, রাজ্জাকের মতো ধ্রুবতারা হয়তো আর আসবে না। ৬৫ টাকার সেই সংগ্রামই তাকে শিখিয়েছিল কীভাবে কোটি মানুষের হৃদয়ে রাজত্ব করতে হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে। আজ তার জন্মদিনে তাকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে পুরো জাতি।

