বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘকালীন রীতি মেনে আধ্যাত্মিক নগরী সিলেট থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণার যাত্রা শুরু করলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বুধবার সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে গুলশানের বাসভবন থেকে যখন তার গাড়িবহর বিমানবন্দরের পথে রওনা হয়, তখন থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় নতুন গুঞ্জন। দীর্ঘ ১৬ বছরের রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এটি তার এক গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সফর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিটে তিনি রাজধানীর গুলশান থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। রাত সোয়া আটটা নাগাদ তার সিলেটে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই সফরকে কেন্দ্র করে সিলেটের রাজপথ থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে এক ধরনের উৎসবমুখর আমেজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর দলীয় প্রধানের সশরীরে উপস্থিতি মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।
সিলেটে পৌঁছানোর পর তারেক রহমানের প্রথম গন্তব্য হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার শরিফ। গভীর রাতে তিনি সেখানে জিয়ারত সম্পন্ন করবেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সিলেটকে ধরা হয় পুণ্যভূমি হিসেবে, যেখান থেকে আশীর্বাদ নিয়ে বড় কোনো আন্দোলনের ডাক বা নির্বাচনের সূচনা করা হয়। তারেক রহমানের এই সফর সেই পুরনো ঐতিহ্যকেই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
সফরের মূল আকর্ষণ থাকছে বৃহস্পতিবার সকালে। সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে একটি বিশাল জনসভায় ভাষণ দেবেন তিনি। এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের প্রতিটি কোণ যেন এখন সাজ সাজ রবে মুখর। নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, এই সমাবেশ থেকে আগামী দিনের রাজনীতির একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা আসবে।
তবে এই সফর কেবল সিলেট নগরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। তারেক রহমানের এই যাত্রাপথটি বেশ দীর্ঘ এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সিলেট সফর শেষে তিনি পর্যায়ক্রমে মৌলভীবাজারের শেরপুর, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে নির্ধারিত পথসভাগুলোতে অংশ নেবেন। প্রতিটি পয়েন্টে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখবেন তিনি।
এরপর তার গাড়িবহর এগোবে কিশোরগঞ্জের ভৈরব ও নরসিংদীর দিকে। সবশেষে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সমাবেশের মাধ্যমে এই দফার সফর শেষ করে তিনি ঢাকায় ফিরবেন। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে তারেক রহমান মূলত দেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোর সাংগঠনিক শক্তি পরখ করে নিতে চাইছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল নির্বাচনী প্রচারণা নয়, বরং তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের সংযোগ স্থাপনের একটি সুপরিকল্পিত মহড়া।
বিএনপির মুখপাত্র মাহাদী আমীন জানিয়েছেন, এই সফরে এক অভিনব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারেক রহমান। বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা রাজপথে থেকে লড়াই করেছেন, সেই সব ত্যাগী ও তরুণ নেতাদের তিনি নিজের সফরসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এটি মূলত আন্দোলনরত কর্মীদের প্রতি এক ধরনের স্বীকৃতি ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। তাদের আত্মত্যাগকে মূল্যায়ন করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এবারের সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, মামুন হাসান, আবদুল মোনায়েম মুন্না এবং কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণের মতো পরিচিত মুখগুলো। এছাড়াও ইয়াসীন ফেরদৌস মুরাদ এবং রাকিবুল ইসলাম রাকিবের মতো তরুণ নেতারা এই বহরে যুক্ত হয়েছেন। আগামী দিনের সফরগুলোতে পর্যায়ক্রমে আরও অনেক সংগ্রামী নেতাকে দলের পক্ষ থেকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে তারেক রহমানের এই সক্রিয়তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতুহল দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সমীকরণ যখন দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন বিএনপির এই শক্তি প্রদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সফরের মাধ্যমে তারেক রহমান দলের ঐক্য বজায় রাখার পাশাপাশি জনসমর্থনের একটি বড় মহড়া দিতে সক্ষম হবেন।
বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের মতে, এই নির্বাচনী প্রচারণা কেবল ভোট চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত ১৬ বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনমতকে আরও সংহত করার একটি প্রক্রিয়া। তারেক রহমান প্রতিটি জনসভায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে কথা বলবেন। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের অধিকার পুনরুদ্ধার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিই হবে তার ভাষণের মূল উপজীব্য।
সিলেটের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে এখন তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত ব্যানার ও ফেস্টুন শোভা পাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এই রাজনৈতিক চাঞ্চল্যকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। হোটেলের কর্মচারী থেকে শুরু করে রিকশাচালক—সবার মুখেই এখন আলোচনা, দীর্ঘ সময় পর বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সাক্ষী হতে যাচ্ছে এই পুণ্যভূমি। নিরাপত্তার খাতিরে এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় বিএনপি ব্যাপক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী মোতায়েন করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, তারেক রহমানের এই ধারাবাহিক পথসভাগুলো আগামী দিনের আন্দোলনে বড় ভূমিকা রাখবে। কারণ, সশরীরে উপস্থিত হয়ে তৃণমূলের কর্মীদের সাথে কথা বলা এবং তাদের অভাব-অভিযোগ শোনা যেকোনো নেতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারেক রহমান সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন এবং সিলেট থেকে শুরু হওয়া এই তরঙ্গ ঢাকা পর্যন্ত কতটুকু প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পুরো দিনটির কর্মসূচি শেষে গভীর রাতে তার গুলশানের বাসভবনে ফেরার কথা রয়েছে। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের সফরে তিনি যে রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন, তা দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বের ওপর তার ভরসা রাখা এবং তাদের সাথে নিয়ে পথ চলা বিএনপির আগামী দিনের রাজনীতির নতুন এক চিত্র তুলে ধরছে।

