১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে বিএনপি। দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিভিন্ন আসনে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে থেকে যাওয়ায় ৫৯ জন নেতাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে দলটি।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। এর আগে গত ৩০ ডিসেম্বর একইভাবে ১১ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে নির্বাচনের আগমুহূর্তে শুদ্ধি অভিযানে নামল সংসদের প্রধান বিরোধী এই দলটি।
বিএনপির দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, সারা দেশের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই দলের প্রভাবশালী অনেক নেতা বহিষ্কারের তালিকায় পড়েছেন। দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের এই বহিষ্কার তৃণমূল রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে।
ঢাকা বিভাগে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান আঙুর এবং টাঙ্গাইল-৩ আসনের লুৎফর রহমান খান আজাদের মতো হেভিওয়েট নেতারা বহিষ্কৃত হয়েছেন। এছাড়া টাঙ্গাইল-৫ আসনের ফরহাদ ইকবাল এবং মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের মো. মহিউদ্দিনকেও দল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে গোপালগঞ্জ-৩ আসনে প্রার্থী হওয়া হাবিবুর রহমান হাবিব এবং রাজবাড়ী-২ আসনের নাসিরুল হক সাবুসহ বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ এখন দলের বাইরে।
চট্টগ্রাম বিভাগে নোয়াখালী-৬ আসনের ফজলুল আজীম ও তানবীর উদ্দীন রাজীবকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কুমিল্লা বিভাগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের কামরুজ্জামান মামুন এবং চাঁদপুর-৪ আসনের এম এ হান্নানকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগে নাটোর-১ আসনের প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপু ও ডা. ইয়াসির আরশাদ রাজন এবং রাজশাহী-৫ আসনের ব্যারিস্টার রেজাউল করিম বহিষ্কৃত হয়েছেন। রংপুর বিভাগে দিনাজপুর-৫ আসনের এ জেড এম রেজয়ানুল হকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সিলেট বিভাগে মৌলভীবাজার-৪ আসনের মহসিন মিয়া মধু এবং হবিগঞ্জ-১ আসনের শেখ সুজাত মিয়া দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় বহিষ্কৃত হয়েছেন। খুলনা বিভাগে বাগেরহাট-১ ও ৪ আসনের দুই প্রকৌশলীসহ ছয়জনকে এবং বরিশাল বিভাগে দুইজনকে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি সূত্র জানায়, দলীয় প্রতীকের প্রার্থীর বিরুদ্ধে যারা স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছেন, তাদের সরে দাঁড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনড় রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, “বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল দল। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই লড়াইয়ে ব্যক্তিস্বার্থের জন্য দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই। যারা শহীদ জিয়ার আদর্শ এবং দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গেছেন, তাদের সঙ্গে বিএনপির আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না।”
একদিকে বড় একটি অংশকে বহিষ্কার করে শৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা করলেও, মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব কী হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, বহিষ্কৃত এই নেতারা ভোট ব্যাংক কাটলে দলীয় প্রতীকের প্রার্থীদের জয় কঠিন হতে পারে। আবার কারোর মতে, এই কঠোর বার্তার ফলে কর্মীরা বিভ্রান্তি কাটিয়ে মূল ধারার প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হবে।
সব মিলিয়ে, ৫৯ নেতার বিদায়ে নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে বিএনপির অন্দরে বইছে ঝড়। এখন দেখার বিষয়, বহিষ্কৃত এই ‘বিদ্রোহীরা’ ভোটের মাঠে কতটা শক্ত লড়াই দিতে পারেন।

