১৯৭৯ সালের উত্তাল জানুয়ারিতে স্বামী মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির সঙ্গে যখন তেহরান ছেড়েছিলেন, তখন ফারাহ পাহলভি হয়তো ভাবেননি যে দীর্ঘ ৪৭ বছর পর আবারও এক গণবিপ্লবের হাতছানিতে ইরানে ফেরার স্বপ্ন দেখবেন। সম্প্রতি ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া নজিরবিহীন বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ইরানের সাবেক এই সম্রাজ্ঞী।
বুধবার প্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারে ফারাহ পাহলভি অত্যন্ত প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলেন, “ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই। এই পথ একমুখী এবং তা স্বাধীনতার দিকেই যাচ্ছে।”
গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরবর্তীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। সামরিক বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন ফারাহ। তিনি বলেন, “ইরানের তরুণরা আজ ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় লিখছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে এই অসম লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত তোমরাই জয়ী হবে।”
তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘ইরানের সাহসী সন্তান’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের মা-বাবাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তার মতে, ইরানের এই বিজয় কেবল একটি দেশের নয়, বরং পুরো বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার বিজয় হবে।
বিক্ষোভের স্লোগানে প্রায়ই শোনা গেছে রেজা পাহলভির নাম। ফারাহ পাহলভির বড় ছেলে রেজা পাহলভি বর্তমানে নির্বাসিত বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান মুখ। ছেলের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে ফারাহ বলেন, “রেজা বরাবরই বলে এসেছে, ইরানের জনগণই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। সে নিজেকে কেবল তরুণ ইরানিদের মুখপাত্র হিসেবে দেখে। জনগণ তাকে যে ভূমিকা দেবে, সে তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে।”
ফারাহ পাহলভি স্পষ্ট করে দেন যে, তার ছেলে রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধার নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক ইরানের আবির্ভাব নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের সামরিক হস্তক্ষেপ চান কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে সম্রাজ্ঞী কৌশলী উত্তর দেন। তিনি বলেন, “আমি বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়ে সারা বিশ্বের মানুষের বিবেক ও সংহতির কাছে আবেদন জানাই। সাধারণ উদাসীনতার মধ্যে যেন হাজার হাজার ইরানির জীবন হারিয়ে না যায়। বিশ্ব যেন মনে রাখে, সভ্যতার আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত এই দেশে এখন কী ঘটছে।”
পাহলভি পরিবারের এই সম্রাজ্ঞীকে দেশটির অনেকেই এখনও ভালোবেসে ‘ইরানের মা’ বলে ডাকেন। নির্বাসিত এই জীবনে তার দীর্ঘদিনের আকুতি কেবল এক পলক স্বদেশ দেখার। সাক্ষাৎকারের শেষে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, “৪৭ বছর ধরে আমি ইরানের স্বাধীনতার জন্য অপেক্ষা করছি। আজ আমার একমাত্র ইচ্ছা এবং প্রয়োজন হলো ইরানে ফিরে যাওয়া এবং আমার এই অসাধারণ সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরা।” যেকোনো সন্তানহারা মায়ের মতো করুণ সুরে তিনি বলেন, “আমার মনে হচ্ছে এই পুনর্মিলন খুব শিগগিরই ঘটবে।”

