মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত ও রহস্যময় চরিত্র, সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের চাচা রিফাত আল-আসাদ আর নেই। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ৮৮ বছর বয়সে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি। সমালোচকদের কাছে ‘হামার কসাই’ হিসেবে পরিচিত এই সাবেক সেনাসমর্থিত নেতা এক বর্ণাঢ্য ও বিতর্কিত রাজনৈতিক জীবনের ইতি টেনে পরপারে পাড়ি জমালেন।
রিফাত আল-আসাদের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্রের বরাতে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘদিনের নির্বাসিত জীবন এবং সিরিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উত্থান-পতনের এক নাটকীয় সাক্ষী ছিলেন তিনি।
রিফাত আল-আসাদের নাম শুনলে আজও সিরিয়ার সাধারণ মানুষের মনে ভেসে ওঠে ১৯৮২ সালের সেই ভয়াবহ স্মৃতি। তৎকালীন সিরীয় সরকার ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের দমন করতে হামা শহরে এক নির্মম অভিযান চালায়। সেই অভিযানের প্রধান সেনাপতি ছিলেন রিফাত আল-আসাদ। ইতিহাসে বলা হয়, কয়েক সপ্তাহের সেই রক্তক্ষয়ী অভিযানে ১০ থেকে ৪০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এই নৃশংসতার কারণেই বিশ্বজুড়ে তিনি ‘হামার কসাই’ বা ‘বাচার অব হামা’ হিসেবে পরিচিতি পান।
১৯৭০ সালে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাশার আল-আসাদের বাবা হাফেজ আল-আসাদকে সিরিয়ার ক্ষমতায় বসাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন ছোট ভাই রিফাত। তবে ক্ষমতার লোভ শেষ পর্যন্ত দুই ভাইয়ের মধ্যে ফাটল ধরায়। ১৯৮৪ সালে বড় ভাই হাফেজ অসুস্থ থাকাকালীন রিফাত ক্ষমতা দখলের একটি ব্যর্থ চেষ্টা করেন। এর ফলে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয় এবং তিনি দীর্ঘ কয়েক দশকের জন্য ফ্রান্সে নির্বাসিত হন।
২০০০ সালে হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর তিনি নিজেকেই সিরিয়ার বৈধ উত্তরসূরি দাবি করেছিলেন। তবে তার ভাতিজা বাশার আল-আসাদ ক্ষমতা গ্রহণ করলে সেই দাবি ধোপে টেকেনি। ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বিদেশ থেকেই বাশারের কড়া সমালোচনা করেন এবং তাকে ক্ষমতা ছাড়ার আহ্বান জানান।
ফ্রান্সে থাকাকালীন সিরিয়ার সরকারি তহবিল তছরুপ করে কোটি কোটি ইউরোর সম্পদ অর্জনের দায়ে তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে কারাবরণ এড়াতে ২০২১ সালে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে আবারও সিরিয়ায় ফিরে আসেন তিনি। ধারণা করা হয়, বাশার আল-আসাদ ব্যক্তিগত মমতায় তাকে দেশে ফেরার অনুমতি দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালে এক অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থানে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রিফাত আল-আসাদের জীবন আবারও নাটকীয় মোড় নেয়। রাশিয়ার একটি বিমানঘাঁটি দিয়ে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তিনি। শেষ পর্যন্ত একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীর পিঠে চড়ে নদী পার হয়ে লেবাননে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আশ্রয় নেন।
রিফাত আল-আসাদের মৃত্যুতে সিরিয়ার আসাদ রাজবংশের ইতিহাসের একটি কালো ও নিষ্ঠুর অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তিনি ছিলেন আসাদ পরিবারের এক শক্তিশালী স্তম্ভ, যিনি নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। দুবাইয়ের মাটিতে তার এই নিভৃত মৃত্যু সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও স্বৈরশাসনের এক বিশাল উপাখ্যানের যবনিকাপাত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

