রূপালি পর্দার সেই মায়াবী আলো আর চিরচেনা নাচের ছন্দ থামিয়ে দিয়ে পরপারে পাড়ি জমালেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা ও নৃত্যশিল্পী ইলিয়াস জাভেদ। বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
দীর্ঘদিন ধরে মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন সত্তর ও আশির দশকের এই পর্দা কাঁপানো নায়ক। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে ঢালিউডের ইতিহাসের একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে চলচ্চিত্রাঙ্গনসহ দেশজুড়ে।
ইলিয়াস জাভেদ ছিলেন ঢালিউডের ইতিহাসে এমন একজন বিরল প্রতিভা, যিনি অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্যশৈলী দিয়ে দর্শকদের বুঁদ করে রাখতেন। ‘নিশান’, ‘নরম গরম’, ‘তিন রাজকন্যা’ কিংবা ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’র মতো অসংখ্য কালজয়ী সিনেমায় তার পারফরম্যান্স আজও সিনেমাপ্রেমীদের মনে সতেজ। বিশেষ করে ফোক-ফ্যান্টাসি ঘরানার সিনেমায় তার বিকল্প কেউ ছিল না।
জাভেদের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বর্তমান সময়ের ঢালিউড মেগাস্টার শাকিব খান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় তিনি এই বর্ষীয়ান অভিনেতাকে একজন ‘অভিভাবক’ হিসেবে অভিহিত করেন।
শাকিব খান তার শোকবার্তায় লিখেছেন, “চলে গেলেন চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা ও নৃত্যপরিচালক শ্রদ্ধেয় ইলিয়াস জাভেদ। তাঁর প্রয়াণে আমরা শুধু একজন মহান শিল্পীকে হারাইনি, হারিয়েছি একজন অভিভাবকতুল্য মানুষকেও। চলচ্চিত্র শিল্পে তাঁর অভাব পূরণ হওয়ার নয়।”
শাকিব আরও উল্লেখ করেন যে, জাভেদ তার জাদুকরী নাচের মাধ্যমে ঢালিউডকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “শারীরিক প্রস্থান ঘটলেও জাভেদ সাহেব তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবেন। তাঁর অনুপ্রেরণা আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গনে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
ইলিয়াস জাভেদ কেবল একজন নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ নৃত্য পরিচালকও। সেই ষাট ও সত্তরের দশকে যখন আধুনিক নাচের জোয়ার কেবল শুরু হচ্ছে, তখন তিনি তার নিজস্ব স্টাইল দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন। ঢাকাই সিনেমায় ‘অ্যাকশন-নাচ’ বা গ্ল্যামারাস নাচের সূচনা করেছিলেন তিনি। তার নাচের সাবলীলতা ও অঙ্গভঙ্গি ছিল সমসাময়িক সবার চেয়ে আলাদা।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চলচ্চিত্রের সোনালী দিনের স্মৃতিগুলো আগলে রেখেছিলেন। যদিও শেষ কয়েক বছর ক্যানসারের কারণে নিভৃতে দিন কাটিয়েছেন, তবুও চলচ্চিত্রের মানুষরা তাকে নিয়মিত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতেন।
জাভেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, পরিচালক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। আজ রাতেই বনানী কবরস্থানে বা তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জাভেদ মানেই ছিল রঙিন ফ্যান্টাসি, জাভেদ মানেই ছিল নাচের জাদুকরী ছন্দ। পর্দা থেকে এই রাজপুত্রের বিদায় কেবল একটি শূন্যতা নয়, বরং একটি সুদীর্ঘ যুগের সমাপ্তি।

