আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে নতুন মেরুকরণ। এই পরিস্থিতিতে ‘মব’ বা গণপিটুনির সংস্কৃতির মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “মানুষ এখন অনেক সচেতন। ভয়ভীতি দেখিয়ে বা মব তৈরি করে ভোটারদের সিদ্ধান্ত বদলানোর দিন শেষ হয়ে গেছে।”
বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর কল্যাণপুরে ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত নেতাকর্মীদের দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। গত মঙ্গলবার বিকেলে মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ১৬ জন জামায়াত নেতাকর্মী আহত হন।
হাসপাতালে আহতদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়ার পর জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, গতকাল মিরপুরে বিএনপি কর্মীরা জামায়াতের নারী কর্মীদের ওপর ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, “গতকাল শুধু ভাইদের গায়ে নয়, আমাদের মা-বোনদের গায়েও হাত তোলা হয়েছে। তারা কি মায়ের পেট থেকে জন্ম নেয়নি? এই নোংরা মব বা বিশৃঙ্খলার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।”
ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে, তবে তা দেখার জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও যথাযথ কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা দলের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বা ‘মব’ সৃষ্টি করার কোনো এখতিয়ার নেই।
৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে জামায়াত আমির বলেন, “দয়া করে জনগণের ওপর আস্থা রাখুন। আপনাদের অঙ্গীকার, দলের আদর্শ এবং নিজেদের চরিত্র নিয়ে মানুষের কাছে যান। মানুষ অতীত ও বর্তমান বিচার করে যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই ভোট দেবে। ভোটারদের শান্তিপূর্ণভাবে তাদের পছন্দমতো প্রতীক বাক্সে ফেলার সুযোগ করে দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব।”
তিনি আরও বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরের কায়দায় যদি কেউ নির্বাচনী ময়দানকে ওলটপালট করার চেষ্টা করে, তবে জাগ্রত যুবসমাজ তাদের ক্ষমা করবে না। কারণ এই তরুণেরাই বুকের রক্ত দিয়ে দেশে পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “শুধু ঢাকা-১৫ আসন নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে টুকটাক গোলযোগের খবর পাচ্ছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি মায়েদের গায়ে হাত দেওয়া হচ্ছে, মসজিদের ভেতর ঢুকে গালিগালাজ করা হচ্ছে, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেবল তাকিয়ে দেখছে। এভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।”
তিনি নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যাঁরা সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তপনা করবে, তাঁদের দলীয় পরিচয় না দেখে আইনের কঠোর প্রয়োগ করুন। আমরা এখনই মামলা-মোকদ্দমার পথে গিয়ে পরিস্থিতি জটিল করতে চাই না, তবে আমাদের বাধ্য করবেন না।”
ডা. শফিকুর রহমান জানান, জামায়াতে ইসলামী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—উভয় ক্ষেত্রেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো একটি দুর্নীতিমুক্ত, দুঃশাসনমুক্ত এবং ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপির সঙ্গে কোনো জোটে না গিয়ে আলাদাভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা ঢাকার রাজপথে দুই দলের কর্মীদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সৃষ্টি করেছে।

