দক্ষিণ স্পেনের শান্ত সন্ধ্যাটি মুহূর্তেই বিষাদে ছেয়ে গেল। মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি উচ্চগতির ‘ইরিও’ (Iryo) ট্রেন আচমকা লাইনচ্যুত হয়ে আছড়ে পড়ে বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য একটি ট্রেনের ওপর। রবিবারের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ জনে। কর্ডোবা প্রদেশের আদমুজ শহরের কাছে এই বিপর্যয়টি ঘটে, যা গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা।
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ঠিক ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে এই বিভীষিকা নেমে আসে। রেল কর্তৃপক্ষ ‘আদিফ’ (Adif) জানিয়েছে, ইরিও ট্রেনটি কর্ডোবা স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার মিনিট দশেকের মধ্যেই এই বিপত্তি বাঁধে। ট্রেনটির পেছনের অংশ লাইনচ্যুত হয়ে পাশের ট্র্যাকে ঢুকে পড়লে বিপরীত দিক থেকে আসা মাদ্রিদ-হুয়েলভামুখী একটি ‘রেনফে’ (Renfe) ট্রেনের সঙ্গে সেটির প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়।
উদ্ধারকারীদের জন্য রাতটি ছিল এক নরককুণ্ডের মতো। সংঘর্ষের তীব্রতা এতোটাই ছিল যে ট্রেনের বগিগুলো দুমড়ে-মুচড়ে ১৩ ফুট গভীর এক গিরিখাতের কিনারে আছড়ে পড়ে। কর্ডোবার ফায়ার সার্ভিস প্রধান ফ্রান্সিসকো কারমোনা ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের সামনে এমন পরিস্থিতি ছিল যেখানে জীবিত মানুষের কাছে পৌঁছাতে মৃতদেহগুলো সরিয়ে পথ করতে হয়েছে। এটি বর্ণনাতীত কঠিন এক কাজ ছিল।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত আদমুজ শহরের মেয়র রাফায়েল মোরেনো এই ভয়াবহতাকে একটি ‘দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ঘটনার পরপরই তিনি উদ্ধার কাজে সহায়তার জন্য ছুটে যান। তিনি বলেন, “নিকষ অন্ধকারে চারদিকে কেবল মানুষের হাহাকার আর ধ্বংসস্তূপ ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছিল না।” স্থানীয় বাসিন্দারাও এই দুর্যোগে এগিয়ে এসেছেন; তাঁরা স্ট্রেচার থেকে শুরু করে কম্বল আর খাবার নিয়ে উদ্ধারকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
আন্দালুসিয়ার জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৫২ জনেরও বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে অন্তত ২৪ জনের অবস্থা গুরুতর, যার মধ্যে চারজন শিশুও রয়েছে। আহতদের অধিকাংশকেই কর্ডোবার নিকটবর্তী হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো সারা রাত আলো জ্বালিয়ে ধ্বংসস্তূপের ভেতর তল্লাশি চালিয়েছে এবং এখনও আরও কয়েকজনের নিখোঁজ থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই ঘটনাকে দেশের জন্য একটি ‘গভীর বেদনার রাত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি টুইট বার্তায় শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং উদ্ধার কাজে নিয়োজিত দলগুলোকে ধন্যবাদ দেন। আজ সোমবার তার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে এবং দুর্ঘটনার কবলে পড়া পরিবারগুলোর সহায়তায় একটি বিশেষ কেন্দ্র খোলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে এই দুর্ঘটনাকে ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। কারণ যে স্থানে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সেই ট্র্যাকটি গত বছরের মে মাসেই সংস্কার করা হয়েছিল এবং লাইনচ্যুত হওয়া ট্রেনটিও ছিল মাত্র চার বছরের পুরোনো। বিশেষজ্ঞ দলগুলো এখন তদন্ত করে দেখছে যে কারিগরি ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণে এমন আধুনিক প্রযুক্তির রেল নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের মুখে পড়ল।
ট্রেনে থাকা যাত্রীরাও জানিয়েছেন সেই ভয়াবহ মুহূর্তের কথা। ইরিও ট্রেনের যাত্রী ও সাংবাদিক সালভাদর জিমেনেজ বলেন, “হঠাৎ মনে হলো যেন তীব্র ভূমিকম্প হচ্ছে। জানালার কাঁচ ভেঙে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। অন্ধকারে আমাদের কোনোমতে ভাঙা জানালা দিয়ে বাইরে বের হতে হয়েছে।” দুটি ট্রেন মিলিয়ে প্রায় ৪০০ যাত্রী ছিলেন, যার বেশিরভাগই ছিলেন সাপ্তাহিক ছুটি কাটিয়ে মাদ্রিদে ফিরতে থাকা সাধারণ মানুষ।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জেরে স্পেনের মাদ্রিদ এবং দক্ষিণ আন্দালুসিয়া অঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী ২০০-এর বেশি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। কর্ডোবা, সেভিলে এবং গ্রানাদার মতো বড় শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী। স্পেনের রাজপরিবারও এই ট্র্যাজেডিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
তদন্তকারীদের মতে, দুর্ঘটনার সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। বর্তমানে রেল ট্র্যাক থেকে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে এবং মৃতদের শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্টেলার দুর্ঘটনার পর এটিই স্পেনের রেল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কালো অধ্যায় হয়ে রইল।

