বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সমাধানগুলো চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বৈশ্বিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ‘দায়মুক্তির’ সংস্কৃতি লালন করছে, তা নিয়ে এবার সরাসরি তোপ দেগেছেন খোদ জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস। তার মতে, ওয়াশিংটন এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, তাদের ক্ষমতার দাপট আন্তর্জাতিক আইনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি বিবিসি রেডিও ৪-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে গুতেরেস অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বিশ্বরাজনীতির নেতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ওয়াশিংটনের নীতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট—তারা বহুপাক্ষিক সমাধানকে এখন অপ্রাসঙ্গিক মনে করে। তাদের কাছে এখন একমাত্র বিবেচ্য হলো মার্কিন প্রভাবের বিস্তার, যা অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডকে পাশ কাটিয়ে করা হচ্ছে।”
গুতেরেসের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপে দেশটির প্রেসিডেন্টকে আটক এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রকাশ্য হুমকির ফলে ইউরোপসহ সারা বিশ্বে অস্থিরতা বিরাজ করছে। গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন যে মূল স্তম্ভ—অর্থাৎ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমমর্যাদা—তা এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। কিছু রাষ্ট্র এখন আইনের শাসনের বদলে ‘ক্ষমতার শাসন’ কায়েম করতে চাইছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য বরাবরই জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গত সাধারণ অধিবেশনে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি একাই সাতটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন, যেখানে জাতিসংঘ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ট্রাম্পের এমন কঠোর অবস্থানের জবাবে গুতেরেস স্বীকার করেন যে, শক্তিশালী সদস্য দেশগুলোকে আইন মানাতে জাতিসংঘ বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছে। তবে তিনি এটিও মনে করিয়ে দেন যে, জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা নেই; এই ক্ষমতা বড় শক্তিগুলোর হাতেই কুক্ষিগত।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অকার্যকারিতা নিয়েও সরব হয়েছেন মহাসচিব। বর্তমানে যে কাঠামোতে পাঁচটি দেশ (ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র) ভেটো ক্ষমতা ভোগ করছে, তা ১৯৪৫ সালের পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। গুতেরেসের মতে, “১৯৪৫ সালের পুরনো কাঠামো দিয়ে ২০২৬ সালের আধুনিক ও জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব নয়।” তিনি অভিযোগ করেন, ইউক্রেন থেকে শুরু করে গাজা যুদ্ধ—সব ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত করছে।
গাজা পরিস্থিতিকে জাতিসংঘের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে গুতেরেস বলেন, সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে ইসরায়েল যেভাবে বাধা সৃষ্টি করেছে, তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন। এছাড়াও ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব পরিবর্তনের মতো ঘটনায় পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা বিশ্বকে আরও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
চলতি বছরের শেষে দায়িত্ব ছাড়তে যাওয়া গুতেরেস তার বার্ষিক ভাষণেও এক ‘বিশৃঙ্খলাপূর্ণ বিশ্বের’ কথা বলেছিলেন। তিনি মনে করেন, মানুষ এখন শক্তিশালীদের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। তবে তিনি আশাবাদী যে, বিশ্বনেতারা যদি এখনই ঐক্যবদ্ধ না হন, তবে টেকসই শান্তি অধরাই থেকে যাবে। “সত্য হলো, যদি আমরা শক্তিশালীদের চ্যালেঞ্জ না করি, তবে কখনোই একটি উন্নত বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব হবে না,” যোগ করেন তিনি।
বিশ্বজুড়ে যখন দায়মুক্তি, বৈষম্য এবং অনিশ্চয়তা জেঁকে বসেছে, তখন গুতেরেসের এই সাহসী উচ্চারণ বৈশ্বিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবিকে আরও জোরালো করল। এখন দেখার বিষয়, বড় শক্তিগুলো এই সতর্কবার্তাকে কতটা গুরুত্ব দেয়।

