আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে ঘনীভূত হওয়া অনিশ্চয়তার মেঘ এবার আরও ঘনীভূত হলো। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের ভারত সফরে অনীহার পর, এবার তাদের সমর্থনে নজিরবিহীন এক কড়া পদক্ষেপ নিল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। বাংলাদেশের উদ্বেগকে ‘যৌক্তিক ও বৈধ’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় দলের সব ধরনের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে পাকিস্তানের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘জিও সুপার’ ও ‘পাকিস্তান অবজারভার’ এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিসিবি চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) যদি কোনো সম্মানজনক সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়, তবে পাকিস্তানও এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে ভাববে। এমনকি বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখে টিম ম্যানেজমেন্টকে একটি সমান্তরাল পরিকল্পনা জমার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে মূলত ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে বিসিবির অনড় অবস্থান। সম্প্রতি আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার পর দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কে যে ফাটল ধরেছে, তা এখন বৈশ্বিক আসর বর্জনের হুমকিতে রূপ নিয়েছে। পাকিস্তান মনে করছে, আয়োজক দেশ হওয়ার অজুহাতে কোনো দেশের ওপর চাপ বা হুমকি প্রয়োগ করা আইসিসির নীতিবিরুদ্ধ। পিসিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, “আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে সমর্থন করি। একটি দলের খেলোয়াড়দের সুরক্ষা সবার আগে।”
বিশ্বকাপের বর্তমান সূচি অনুযায়ী, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে এই আসর শুরু হওয়ার কথা। পাকিস্তান রয়েছে ‘গ্রুপ এ’-তে, যাদের ম্যাচগুলো ভারত ও শ্রীলঙ্কা উভয় দেশেই হওয়ার কথা। অন্যদিকে বাংলাদেশ রয়েছে ‘গ্রুপ সি’-তে, যাদের সব ম্যাচ নির্ধারিত হয়েছে ভারতের কলকাতা ও মুম্বাইয়ে। বাংলাদেশ শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, শ্রীলঙ্কায় তাদের ম্যাচগুলো সরিয়ে নেওয়া হোক। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে গ্রুপ অদলবদলের প্রস্তাবটি আইসিসি নাকচ করে দেওয়ায় পরিস্থিতি এখন খাদের কিনারায়।
পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভির এই সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় ধরনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যদি জোটবদ্ধ হয়ে বিশ্বকাপ বর্জনের পথে হাঁটে, তবে আইসিসি বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও দর্শকপ্রিয়তার সংকটে পড়বে। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে যে, শ্রীলঙ্কায় ভেন্যু পাওয়া না গেলে তারা তাদের নিজেদের মাঠে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো আয়োজন করতে প্রস্তুত। যদিও আইসিসি এখনো সূচি বা ভেন্যু পরিবর্তনের বিষয়ে কোনো ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়নি।
আইসিসির দেওয়া ২১ জানুয়ারির সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তপ্ত হচ্ছে ক্রিকেট বিশ্ব। পাকিস্তান দলের অনুশীলন বন্ধ রাখা কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি ভারতের ক্রিকেটীয় একাধিপত্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতীকী প্রতিরোধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওদিকে আইসিসি জানিয়ে রেখেছে, বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত ভারত সফরে না যায়, তবে র্যাঙ্কিং অনুযায়ী স্কটল্যান্ডকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরাশক্তির এমন অনড় অবস্থানের ফলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ এখন বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্নের সামনে। এখন দেখার বিষয়, আইসিসি ২১ জানুয়ারির মধ্যে বিসিবি ও পিসিবিকে সন্তুষ্ট করার মতো কোনো ‘মধ্যপন্থা’ বের করতে পারে কি না। অন্যথায়, ২০২৬ সালের এই মেগা ইভেন্টটি হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বর্জন বা সংকটের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

