ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন, বর্তমান কমিশনের বেশ কিছু পদক্ষেপ পক্ষপাতদুষ্ট এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে তিনি এটিও যোগ করেছেন যে, বিদ্যমান প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ত্রুটিগুলো দ্রুত সংশোধন করলে এই কমিশনের অধীনেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান তিনি। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা স্থায়ী এই বৈঠকে বিএনপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। প্রতিনিধি দলে মির্জা ফখরুলের সঙ্গে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং ইসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব মোহাম্মদ জকরিয়া।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচন কমিশনের বর্তমান কার্যক্রমের কিছু ‘অসংগতি’ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রবাসীদের জন্য পাঠানো পোস্টাল ব্যালটগুলোতে গুরুতর কারিগরি ত্রুটি রয়েছে এবং এগুলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে বলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। তিনি অবিলম্বে সঠিক এবং প্রতীক সংবলিত ব্যালট পেপার সরবরাহের দাবি জানান।
মির্জা ফখরুল বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, কিছু রাজনৈতিক দলের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ ভোটারদের এনআইডি কার্ড, বিকাশ নম্বর এবং মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করছে। ইসির ডাটাবেজ বা ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্যের এমন অপব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এসব তথ্য সংগ্রহের পেছনে কী রহস্য রয়েছে তা কমিশনকে খতিয়ে দেখতে হবে। ভোটারদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কমিশনের মৌলিক দায়িত্ব।”
নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে এখনো ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়নি বলেও দাবি করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি অভিযোগ করেন, ঢাকার বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ভোটারদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। কেন এবং কাদের নির্দেশে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়ে কমিশনকে চিঠি দিয়েছে বিএনপি। তিনি বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ দিলেও কমিশন থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
কমিশনের প্রশাসনিক কাঠামোতে থাকা বেশ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ আনেন তিনি। মির্জা ফখরুল বলেন, “প্রশাসনে এখনো এমন অনেকে আছেন যারা একটি বিশেষ পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন। তাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে কারিগরি ত্রুটিগুলো দ্রুত সমাধান না করলে মানুষের ভোটাধিকার আবারও হুমকির মুখে পড়বে।
এতসব অভিযোগের মাঝেও বিএনপির পক্ষ থেকে আশাবাদের কথা শোনান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচন কমিশন চাইলে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে পারে। তবে তার জন্য কমিশনকে কেবল কথায় নয়, কাজেও নিজেদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে হবে। ভোটারদের আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন ইসির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে বিএনপির এই শক্ত অবস্থান এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এই বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভোটারদের আস্থা অর্জন এবং নির্বাচনকে বিতর্কহীন রাখার জন্য কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো এখন সবার নজর কাড়বে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অবশ্য বিএনপির অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

