গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা চরম উত্তেজনার পর অবশেষে ইরান ইস্যুতে সুর নরম করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরান সরকার রাজনৈতিক বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসায় দেশটির নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন তিনি। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউস ত্যাগের প্রাক্কালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান, যা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে নিজের সপ্তাহান্তের ছুটি কাটাতে যাওয়ার পথে ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, ইরান সরকার আট শতাধিক মানুষের নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাকে তিনি ‘সম্মানের সঙ্গে’ দেখছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সিদ্ধান্ত তাকে ইরান সম্পর্কে ইতিবাচকভাবে ভাবতে প্রভাবিত করেছে।
পরবর্তীতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প সরাসরি ইরানকে ধন্যবাদ জানান। তিনি উল্লেখ করেন, ৮০০ জনের বেশি বন্দিকে গতকাল ফাঁসি দেওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল করা হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমি ইরানের নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি। ধন্যবাদ!”
অথচ মাত্র কয়েক দিন আগেই চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নের খবরে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এমনকি কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন হুঙ্কারও শোনা গিয়েছিল তার মুখে। তবে বর্তমানে বিক্ষোভ স্তিমিত হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের খবর সেই যুদ্ধের মেঘ আপাতত সরিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ইরানে চলমান আন্দোলনে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি’ (HRANA) শুক্রবার জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৭৯৭ জনে পৌঁছেছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক নমনীয় অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই মূল্যায়ন ইরানের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ না হলেও এটি একটি কৌশলগত পিছুটান হতে পারে। এর আগে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ট্রাম্প লিখেছিলেন, “সাহায্য আসছে”। কিন্তু শুক্রবার সেই প্রসঙ্গে তাকে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে তিনি কিছুটা রহস্য বজায় রেখে বলেন, “দেখা যাক সামনে কী হয়।”
এদিকে গুঞ্জন উঠেছিল যে, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের মতো আরব দেশ এবং ইসরায়েলের নেতাদের চাপে পড়েই ট্রাম্প ইরানে হামলার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। তবে এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেন, “কেউ আমাকে প্রভাবিত করেনি। এই সিদ্ধান্তটি আমি নিজেই নিয়েছি।” তিনি আরও যোগ করেন, “গতকাল শত শত ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কাউকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি। এই খবরটি আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় প্রভাব ফেলেছে।”
উল্লেখ্য, গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিবাদে যে জনরোষ শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই ধর্মীয় শাসনের বিরোধিতায় রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইরান সরকার ইন্টারনেটের ওপর কড়াকড়ি আরোপসহ কঠোর দমননীতি গ্রহণ করে। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাজধানী তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে বড় ধরনের কোনো বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি এবং জনজীবনও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে, ইরানের নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি ওয়াশিংটনকে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, ইরানি জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা বজায় রাখা উচিত। তবে ট্রাম্পের বর্তমান ‘ধন্যবাদ’ বার্তার পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের মোড় কোন দিকে ঘোরে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

