বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনার প্রত্যয় নিয়ে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং খুনের রাজনীতির চিরস্থায়ী অবসানের ডাক দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। পুরোনো জরাজীর্ণ রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তে তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও জনআকাঙ্ক্ষাভিত্তিক একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ১১টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত বৃহত্তর নির্বাচনী ঐক্য আজ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নির্বাচনী যাত্রা শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই জোটের পক্ষ থেকে ২৫৩টি আসনে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, বিগত ৫৪ বছর ধরে দেশের রাজনীতিতে যে পচন ধরেছে, তা থেকে মুক্তি পেতে জাতি আজ উন্মুখ হয়ে আছে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, আসন্ন নির্বাচনে কোনো ধরনের ‘ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা পর্দার আড়ালের কারচুপি বরদাস্ত করা হবে না।
জামায়াত আমিরের মতে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে যারা একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, তাদের সমন্বয়েই এই অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংহতি গড়ে তোলা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা এমন এক রাজনীতি দেখতে চাই না যা ফ্যাসিবাদের রূপ নিয়ে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে কিংবা নিরীহ মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতার ইমারত গড়ে। আমরা সেই জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ চাই, যেখানে তরুণদের মেধা ও সততার মূল্যায়ন হবে।”
নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বিশাল এক যুবসমাজ গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই এই ঐক্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তিনি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “যুবসমাজ, তোমরা তোমাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে। তোমাদের পবিত্র আমানত ভোটের হিসাব বুঝে না নিয়ে তোমরা ঘরে ফিরবে না। আমরা প্রতিটি পদক্ষেপে তোমাদের পাশে থাকব।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভোটের দিন কোনো ধরনের ভোট ডাকাতি বা কারচুপির চেষ্টা করা হলে তা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করা হবে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জুলাই বিপ্লবের অন্যতম আইকন ও তার বিপ্লবী সহযোদ্ধা শহীদ শরীফ উসমান বিন হাদিকে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, হাদি ছিলেন শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর। তাকে যারা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, তাদের বিচার নিশ্চিত করা জাতীয় কর্তব্যে পরিণত হয়েছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি এই ধরনের বিপ্লবীদের হত্যার বিচার ধামাচাপা দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে দেশে আর কোনো নির্ভীক নেতৃত্বের জন্ম হবে না। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে যারা ৪৭, ৭১ এবং ২৪-এর আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক গত ১৫ বছরের দুঃসহ শাসনের স্মৃতি চারণ করে বলেন, গুম ও খুনের সেই অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে আমরা এখন এক আলোর পথের যাত্রী। তিনি জুলাই সনদের ৫ দফা দাবির ভিত্তিতে ‘ওয়ান বক্স’ নীতিতে ১১টি দলের একযোগে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিকে ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে তিনি আসন্ন নির্বাচনে এবং একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মার্কায় ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি মজবুত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এই ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, আজকের এই ঘোষণার পর থেকে আমাদের মধ্যে আর কোনো পৃথক দলীয় পরিচয় থাকবে না। আমরা সবাই ১১ দলীয় ঐক্যের অভিন্ন প্রার্থী হিসেবে কাজ করব। এই ঐক্যের মূল লক্ষ্য হবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা।
লিব্যারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) অলি আহমদসহ জোটভুক্ত অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও এই সময় উপস্থিত ছিলেন। সবার সম্মিলিত কণ্ঠস্বরে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে, যেখানে ভোট কারচুপি নয় বরং জনগণের প্রকৃত রায়ের প্রতিফলন ঘটবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

