যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়ে এক প্ররোচনামূলক ভিডিও বার্তা প্রচার করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। ২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ায় ট্রাম্পের ওপর হওয়া প্রাণঘাতী হামলার স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “এবার আর গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না।” বুধবার প্রচারিত এই ভিডিও ক্লিপটি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ওই ভিডিওতে ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই পেনসিলভানিয়ার বাটলারে নির্বাচনী সমাবেশের সেই মুহূর্তটি দেখানো হয়, যেখানে ট্রাম্পের কান ছুঁয়ে একটি গুলি চলে গিয়েছিল।
অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া রক্তাক্ত ট্রাম্পের সেই ছবি ব্যবহারের পর ইরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই খুনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। মূলত গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরানে চলমান নজিরবিহীন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং এর প্রেক্ষিতে ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির পাল্টা জবাব হিসেবেই এই উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে তেহরান।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দমনে ইরান সরকার চরম কঠোরতা অবলম্বন করছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, চলমান সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার থেকে ১২ হাজার পর্যন্ত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই দমন-পীড়নের প্রতিবাদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার ইরানি জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন এবং বিক্ষোভকারীদের ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন যে, ‘সাহায্য আসছে’। এমনকি বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি।
ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানের জবাবে ইরান কেবল সামরিক হুঁশিয়ারিই দেয়নি, বরং তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করেছে। উল্লেখ্য, ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি ইরানের পক্ষ থেকে এটিই প্রথম নয়। ২০২১ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি ছবিতেও ট্রাম্পকে লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।
মূলত ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার থেকে তেহরান কখনোই সরেনি। এমনকি ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে হত্যার ষড়যন্ত্রে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
এদিকে, বুধবার এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সূত্র তাকে নিশ্চিত করেছে যে ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাকাণ্ড কমেছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বর্তমানে ওমান, কাতার ও সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে মধ্যস্থতা করছে। তবুও ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন থেকে আসা এই সরাসরি খুনের হুমকি প্রমাণ করছে যে, কূটনৈতিক আলোচনার পর্দার আড়ালে এক ভয়াবহ প্রতিহিংসার আগুন এখনো জ্বলছে।

