ইরানে চলমান নজিরবিহীন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নিয়ে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। রোববার (১১ জানুয়ারি) ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার ইরানি জনগণের এই আন্দোলনকে ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। একই সাথে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলায় ‘অভিযানের প্রস্তুতি’ জোরদার করছে।
ফ্রান্সভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএফপি এবং ইসরায়েলি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভ এখন ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির ধর্মতান্ত্রিক সরকারের জন্য কঠিনতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরাসরি সরকার পতনের একদফা দাবিতে রূপ নিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার বলেন, “আমরা ইরানি জনগণের স্বাধীনতার সংগ্রামকে সমর্থন করি এবং তাদের সাফল্য কামনা করি। তারা স্বাধীনতার যোগ্য এবং আমাদের শত্রুতা ইরানের জনগণের সঙ্গে নয়, বরং দেশটির শাসনব্যবস্থার সঙ্গে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বর্তমান ইরান সরকার বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার প্রধান রপ্তানিকারক, যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
বিক্ষোভের অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তাদের সক্ষমতা ও অভিযানের প্রস্তুতি বাড়িয়েছে। একজন উচ্চপদস্থ ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন: সেনাবাহিনী ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রতি মুহূর্তের খবর রাখছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিশেষ নিরাপত্তা বৈঠকের মাধ্যমে সম্ভাব্য সব ধরণের প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরান যদি অভ্যন্তরীণ চাপ ডাইভার্ট করতে ইসরায়েলে কোনো উসকানিমূলক হামলা চালায়, তবে ‘শক্ত হাতে’ তার জবাব দেওয়ার জন্য ইসরায়েল প্রস্তুত।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ আজ আইনপ্রণেতাদের সামনে ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি ইরানে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজগুলো হবে তাদের প্রথম লক্ষ্যবস্তু। এমনকি ‘দখলকৃত ভূখণ্ড’ (ইসরায়েল) সরাসরি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় থাকবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের একটি সরাসরি সংঘাত হয়েছিল। সেই যুদ্ধের ক্ষত এবং সাম্প্রতিক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের ফলে ইরানি রিয়ালের রেকর্ড পতনের জেরেই সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, চলমান এই বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এ পর্যন্ত অন্তত ১৯২ জন নিহত হয়েছেন।
বর্তমানে ইসরায়েল ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে যেন ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি এখন কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং তা একটি সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সংঘাতের দিকে মোড় নিচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

