ইরানে চলমান ভয়াবহ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতা এক রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় ও আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহের দাঙ্গা ও সংঘর্ষে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ১০৮ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ইসফাহান প্রদেশেই ৩০ জন নিরাপত্তারক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এ পর্যন্ত অন্তত ১৯২ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে কোনো সামরিক হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েল হবে তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ’ রোববার এক প্রতিবেদনে জানায়, দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় পুলিশ, বাসিজ মিলিশিয়া এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শতাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। দেশটির আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বিশেষ ইউনিটের কমান্ডার জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দাঙ্গা দমনের সময় আরও আটজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া গোলস্তান প্রদেশে রেড ক্রিসেন্টের এক কর্মীও হামলার শিকার হয়ে মারা গেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান সরকার ইতিমধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং অ্যাটর্নি জেনারেল হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, দাঙ্গায় জড়িতদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে।
এদিকে, ইরানের এই অভ্যন্তরীণ সংকট এখন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক দিন ধরে নিয়মিতভাবে ইরানকে সতর্ক করে আসছেন। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র চুপ থাকবে না এবং ‘খুব কঠিন জায়গায়’ আঘাত হানবে। ট্রাম্পের এই হুমকির কড়া জবাব দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ। রোববার পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ভুল হিসাব করে ইরানে হামলা চালায়, তবে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড (ইসরায়েল) এবং এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ও নৌ-চলাচলের সব কেন্দ্র আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।” ঘালিবাফের এই বক্তব্যের সময় অনেক আইনপ্রণেতা ‘আমেরিকার মৃত্যু’ স্লোগান দেন।
মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (আইএইচআর) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সংস্থাটির মতে, নিহতের সংখ্যা ১৯২ ছাড়িয়েছে এবং আহতের সংখ্যা কয়েক হাজার। তারা আরও জানিয়েছে যে, সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কুর্দি ও লুরি জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে দমন-পীড়নের মাত্রা সবচাইতে বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিক্ষোভ কেবল অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে রূপান্তরিত হয়েছে। গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব চরমে পৌঁছেছে। এই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটিতে অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান। ইতিমধ্যে ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে এক বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে আইআরজিসি।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় পরিস্থিতি এখন এক সুতোর ওপর ঝুলে আছে। ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি এবং ইরানের পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি এই অঞ্চলকে একটি বড় ধরণের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্বনেতারা।

