প্রকৃতির রুদ্ররূপ দেখল অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য কুইন্সল্যান্ড। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘কোজি’র আঘাতে প্রদেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। আজ রোববার স্থানীয় সময় ভোরবেলায় ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলীয় অঞ্চলে আছড়ে পড়লে এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি’র এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঝড়ের প্রভাবে বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার ভোরে কুইন্সল্যান্ডের আয়ার অ্যান্ড ব্রাউন শহরের উপকূলীয় এলাকায় প্রথম আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘কোজি’। সেই সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৯৫ কিলোমিটার। ঝড়ের কেন্দ্রস্থল থেকে কুইন্সল্যান্ডের প্রশাসনিক রাজধানী ব্রিসবেনের দূরত্ব প্রায় ৫০০ কিলোমিটার হওয়া সত্ত্বেও, রাজধানীর জনজীবনে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ঝোড়ো হাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ লোকালয়ে পানি ঢুকিয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
কুইন্সল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী ডেভিড ক্রিসাফুল্লির দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক জরুরি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পরপরই ব্রিসবেনসহ কুইন্সল্যান্ডের বিভিন্ন শহর ও মফস্বলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, প্রায় ১৫ হাজারেরও বেশি বসতবাড়ি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে। উপড়ে পড়া গাছপালা এবং ছিঁড়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক তারের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা জরুরি উদ্ধারকাজেও বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
তবে কেবল বাতাসের গতিবেগ নয়, ঘূর্ণিঝড় ‘কোজি’র সঙ্গে আসা অতি ভারী বর্ষণই কুইন্সল্যান্ডের জন্য প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝড়টি মূল ভূখণ্ডে আসার অন্তত দুই দিন আগে থেকেই পুরো রাজ্যজুড়ে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া দপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টায় কুইন্সল্যান্ডের বেশ কিছু এলাকায় ২০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই অতিবৃষ্টির ফলে নিচু এলাকাগুলোতে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং ভূমিধসের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করে জানিয়েছেন যে, ঘূর্ণিঝড়টি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে এলেও এর রেশ এখনই কাটছে না। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কুইন্সল্যান্ডের বিভিন্ন অংশে শক্তিশালী ঝড়ো হাওয়া এবং ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। রাজ্য সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপকূলীয় বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টির প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। ঘূর্ণিঝড় ‘কোজি’র এই আকস্মিক আঘাত কুইন্সল্যান্ডের দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতাকে আবারও পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক জায়গায় মেরামতের কাজে দেরি হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা এখন ঝড়ের তাণ্ডব থামার এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

