আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমান্তরালে আয়োজিত ঐতিহাসিক গণভোটকে কেন্দ্র করে নতুন রণকৌশল সাজিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই গণভোটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও সংবিধান সংস্কারের পক্ষে জনমত গঠন এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটকে জয়ী করতে দেশব্যাপী এক নজিরবিহীন প্রচার কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে দলটি। যেসব আসনে এনসিপির নিজস্ব প্রার্থী নেই, সেখানে ‘অ্যাম্বাসেডর’ বা বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে এই প্রচারণা চালানো হবে। শনিবার (১০ জানুয়ারি) এনসিপির নীতিনির্ধারক ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে এই বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, এই বিশাল প্রচার কর্মযজ্ঞের সরাসরি নেতৃত্বে থাকবেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান এবং জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। চলতি সপ্তাহ থেকেই দেশজুড়ে এই ক্যাম্পেইন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। মূলত সাধারণ ভোটারদের কাছে গণভোটের গুরুত্ব এবং কেন ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া জরুরি, তা পৌঁছে দিতেই এই ‘অ্যাম্বাসেডর’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী টিম ইতিমধ্যে প্রচারণাপত্র ও মাঠ পর্যায়ের কৌশলপত্র চূড়ান্ত করেছে।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ জানান, গণভোটের গুরুত্ব সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করতে এনসিপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৭০টি আসনে বিশেষ প্রতিনিধি বা ‘অ্যাম্বাসেডর’ নিয়োগ দিচ্ছে। তিনি বলেন, “যেসব আসনে আমাদের দলীয় প্রার্থী থাকবে, সেখানে প্রার্থীরাই গণভোটের প্রচারণা চালাবেন। কিন্তু যেসব আসনে আমরা প্রার্থী দিচ্ছি না, সেখানেও যেন মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোটের গুরুত্ব বুঝতে পারে, সেজন্য আমরা ২৭০ জন বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছি। তাদের কাজ হবে সাধারণ জনগণকে সচেতন করা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে গণভোটের প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে বলা।”
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে ‘কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি’ পুনর্গঠন করেছে এনসিপি। ৩১ সদস্যের এই শক্তিশালী কমিটিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে চেয়ারম্যান এবং মনিরা শারমিনকে সেক্রেটারি মনোনীত করা হয়েছে। কমিটিতে ব্যারিস্টার ওমর ফারুক, নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি এবং হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো পরিচিত মুখগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কমিটি কেবল নির্বাচন নয়, বরং পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আইনি সহায়তা, মিডিয়া মনিটরিং এবং গণভোটের প্রচার কার্যক্রম তদারকি করবে।
রাজনৈতিক সমীকরণে এনসিপি এবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত এনসিপির ৪৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পর অনেক প্রার্থী জোটের স্বার্থে সরে দাঁড়াতে পারেন। তবে জোটগত লড়াইয়ের পাশাপাশি গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণাটি এনসিপি নিজস্ব স্বকীয়তায় সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চায়। দলটির নেতারা মনে করছেন, এই ২৭০ জন অ্যাম্বাসেডর কেবল ভোটের প্রচার নয়, বরং মাঠ পর্যায়ে জুলাই বিপ্লবের আদর্শ ও নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা প্রচারের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে গণভোটের বিষয়টি যেন গৌণ হয়ে না পড়ে, সেজন্য এনসিপির এই ‘অ্যাম্বাসেডর’ মডেল একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। আসিফ মাহমুদের মতো তরুণ ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব এই প্রচারণার ফ্রন্টলাইনে থাকায় যুব সমাজের মধ্যে গণভোট নিয়ে বাড়তি আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই অ্যাম্বাসেডরদের তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে এবং তারা একযোগে সারা দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ শুরু করবেন।

