ভেনেজুয়েলার নাটকীয় পটপরিবর্তনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার দক্ষিণ প্রতিবেশী মেক্সিকোতে সামরিক অভিযানের প্রকাশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মেক্সিকোভিত্তিক শক্তিশালী মাদক পাচারকারী গোষ্ঠী বা ‘কার্টেল’গুলোকে নির্মূল করার লক্ষ্যে দেশটিতে মার্কিন স্থলবাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন তিনি। ওয়াশিংটনের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপ লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে এক চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে মেক্সিকোর অপরাধী চক্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিষাক্ত মাদক এবং অবৈধ অভিবাসীদের জোয়ারের মতো পাঠিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিপন্ন করছে। ট্রাম্প বলেন, “আমরা গত কয়েক মাস ধরে সাগরপথে এই গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালাচ্ছি এবং ইতোমধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ মাদক পাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
এখন সময় এসেছে এই বিষবৃক্ষকে সমূলে উৎপাটন করার। শিগগিরই আমরা মেক্সিকোতে স্থল অভিযান শুরু করতে যাচ্ছি।” মেক্সিকোর বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, দেশটিতে এখন মাদক মাফিয়াদের প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে তারাই কার্যত রাষ্ট্র চালাচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ক্যারিবীয় সাগরে মেক্সিকান মাদক সম্রাটদের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনী এক ব্যাপকভিত্তিক অভিযান শুরু করে। পেন্টাগনের তথ্যমতে, সেই অভিযানে এ পর্যন্ত অন্তত ১১৫ জন পাচারকারী নিহত হয়েছে এবং ধ্বংস করা হয়েছে ৩৫টি নৌযান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন কমান্ডোদের ‘অপারেশন অ্যাবস্যালুট ডিজল্ভ’ পরিচালনা করার পর ট্রাম্পের এই নতুন হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের এলিট ‘ডেল্টা ফোর্স’ ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে। বর্তমানে তারা নিউইয়র্কের ফেডারেল কারাগারে বন্দি রয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্র পাচারের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ঘটনার পরপরই কলম্বিয়া, কিউবা এবং মেক্সিকোকে লক্ষ্য করে কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে মেক্সিকোর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাউম যুক্তরাষ্ট্রের এই সার্বভৌমত্ব পরিপন্থী অবস্থানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। শুক্রবার রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিকে সরাসরি নাকচ করে দেন।
শিনবাউম স্পষ্টভাবে বলেন, “মেক্সিকোর সরকারের অনুমোদন ছাড়া আমাদের পবিত্র মাটিতে কোনো বিদেশি সামরিক অভিযান সম্ভব নয়। আমরা ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, মেক্সিকোর জনগণ পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমমর্যাদায় বিশ্বাসী; কোনো ধরনের অধীনতা বা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে নয়।”
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ‘একপাক্ষিক সামরিক নীতি’ লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলতে পারে। মেক্সিকোর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদার দেশে সামরিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই নষ্ট করবে না, বরং সমগ্র উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে একটি দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। হোয়াইট হাউস যদি সত্যিই স্থল অভিযানের পথে হাঁটে, তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে বলে মনে করছেন কূটনীতিবিদরা।

