বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) চলমান আসরে ফিক্সিং বা দুর্নীতির ছায়া রুখতে নজিরবিহীন কড়াকড়ি শুরু করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অ্যান্টি করাপশন ইউনিট (আকু)। তবে এই কড়াকড়ি করতে গিয়ে ক্রিকেটারদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এবং খেলার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে দেশের ক্রিকেট মহলে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ক্যাপিটালসের পক্ষ থেকে ক্রিকেটারদের ব্যাটিংয়ে নামার আগে জেরা করা এবং বিনা নোটিশে কক্ষে প্রবেশের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের প্রধান কোচ হান্নান সরকার।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে সাবেক এই জাতীয় ক্রিকেটার ও বর্তমান কোচ হান্নান সরকার আকুর তৎপরতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিয়মতান্ত্রিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দুর্নীতি দমনে যেকোনো কঠোর পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন থাকলেও তা যেন অবশ্যই নির্ধারিত গাইডলাইন বা বিধিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
হান্নান সরকার বলেন, “আমি এর আগে ম্যানেজার এবং কোচ হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। এবারের আসরে অ্যান্টি করাপশন ইউনিটের পক্ষ থেকে যে কড়াকড়ি দেখা যাচ্ছে, তা আগের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপই একটি সঠিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হওয়া জরুরি।”
গত শুক্রবার ঢাকা ক্যাপিটালস এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অভিযোগ তোলে যে, তাদের ক্রিকেটারদের ড্রেসিংরুমে এমনকি ব্যাটিংয়ে নামার ঠিক আগমুহূর্তে জেরা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে হান্নান সরকার জানান, কোনো ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত কক্ষ তল্লাশি করা বা মোবাইল ফোন পরীক্ষা করার পূর্ণ অধিকার আকুর রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রীতি অনুযায়ী, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দলের ম্যানেজারকে অবহিত করার নিয়ম রয়েছে। যদি নিয়ম মেনে এই তল্লাশি চালানো হয়, তবে সেখানে কোনো দ্বিমত থাকার অবকাশ নেই।
তবে ম্যাচ চলাকালীন বা ব্যাটিংয়ে নামার আগে ক্রিকেটারদের ওপর কোনো ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করাকে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন রাজশাহীর এই প্রধান কোচ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “খেলার মাঝপথে যখন একজন ক্রিকেটার মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা জেরা করা ক্রিকেটের স্বাভাবিক মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তবে তা অবশ্যই দলের ম্যানেজারের মাধ্যমে আসতে হবে। আমার দলের ক্ষেত্রে যদি নিয়মের বাইরে গিয়ে এমন হস্তক্ষেপ করা হয়, তবে আমি নিশ্চিতভাবেই তা মেনে নেব না।”
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, বিপিএলের মতো হাই-প্রোফাইল টুর্নামেন্টে ফিক্সিংয়ের ইতিহাস থাকায় আকুর এই অতি-সতর্কতা অমূলক নয়। তবে মাঠের ভেতরে ক্রিকেটারদের একান্ত পরিসরে বা ড্রেসিংরুমে আকুর গতিবিধি যদি ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে তা টুর্নামেন্টের গুণগত মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
হান্নান সরকারের এই মন্তব্য মূলত বিসিবি এবং আকুর কর্মকর্তাদের প্রতি একটি পরোক্ষ বার্তা, যেখানে তিনি নিরাপত্তা এবং খেলার মর্যাদা—উভয়কেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিপিএলের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হলে দুর্নীতি দমন ইউনিটের কার্যক্রম যেন কোনোভাবেই ক্রিকেটারদের জন্য হয়রানির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

