বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ দেড় যুগের স্থবিরতা ও নির্বাসন কাটিয়ে এক নতুন মেরুকরণের ডাক দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বর্জন করে কেবল জনকল্যাণ ও জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার এক মহাপরিকল্পনা উন্মোচন করেছেন তিনি।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানী ঢাকার বনানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে এক শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এই নতুন রাজনৈতিক দর্শনের কথা তুলে ধরেন। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিভেদ ভুলে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে তার এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান দেশের মানুষের রাজনৈতিক ও মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, হিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। আমরা আর পেছনে ফিরে যেতে চাই না।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, রাজনৈতিক অঙ্গনে মতাদর্শের পার্থক্য থাকাটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, তবে সেই পার্থক্য যেন কোনোভাবেই জাতীয় বিভেদে রূপ না নেয়। মতপার্থক্যকে সংলাপে রূপান্তর করে একযোগে কাজ করার মাধ্যমেই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমান তার দলের আগামী দিনের নির্বাচনী ইশতেহারের একটি যুগান্তকারী অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা পারিবারিক সুরক্ষা কার্ডের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি ঘোষণা করেন, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের জন্য এই সর্বজনীন কার্ড চালু করা হবে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বিশেষত্ব হলো, কার্ডটির মূল নিয়ন্ত্রণ থাকবে পরিবারের মা বা গৃহিণীর হাতে।
গবেষণালব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, যখন কোনো অর্থ সাহায্য পরিবারের নারীর হাতে পৌঁছায়, তখন তা মূলত সন্তানদের শিক্ষা, পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যের পেছনে ব্যয় হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার মাসে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী গ্রহণ করতে পারবে। কোনো ধরনের দলীয় পরিচয় বা শ্রেণিবিভাগ না রেখে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, যাতে দুর্নীতির ছিদ্রপথ বন্ধ করা যায়।
স্বাস্থ্যখাত নিয়ে তারেক রহমানের পরিকল্পনা ছিল আধুনিক ও প্রতিরোধমূলক বা ‘প্রিভেন্টিভ’। তিনি উন্নত বিশ্বের আদলে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তাব করেন যেখানে মানুষ অসুস্থ হওয়ার আগেই তাকে সচেতন করার ব্যবস্থা থাকবে। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন, যার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই হবেন নারী।
এই বিশাল কর্মী বাহিনী দেশের প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘরে গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং পুষ্টির বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করবেন। এতে যেমন একদিকে গ্রামীণ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত নারীর জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কুশল বিনিময়কালে তারেক রহমান গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি উপস্থিত সংবাদকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা আমাদের এমনভাবে সমালোচনা করুন যাতে আমরা নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে জনগণের সমস্যার সমাধান করতে পারি।”
অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তারেক রহমানের এই জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনাগুলো মূলত তার ঘোষিত ‘৩১ দফা’ এবং ‘রাষ্ট্র গঠনের ৮টি পরিকল্পনা’র অংশ। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার এই নতুন লড়াই আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক পুঁজি হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

