আগামীকাল (রোববার) বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এর দ্বাদশ আসরের নিলাম অনুষ্ঠিত হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিপিএল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রকাশিত দেশীয় ক্রিকেটারদের চূড়ান্ত তালিকা থেকে এনামুল হক বিজয়, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতসহ আটজন ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হওয়ায় সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
সাধারণত নিলামের আগে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মধ্যে খেলোয়াড়দের মূল্য ও সম্ভাব্য লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা চললেও, এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই অপ্রত্যাশিত বাদ পড়ার ঘটনা। ফিক্সিংয়ে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহের পরিপ্রেক্ষিতে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর এনামুল হক বিজয় এবং মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত বোর্ডের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় আইনি পথে হাঁটার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল জানিয়েছে, স্থানীয় খেলোয়াড়দের তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতেই তারা এই বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চলতি মাসের শুরুর দিকে বিসিবি সভাপতি একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন গ্রহণ করেন। এরপর সেই প্রতিবেদনে সম্ভাব্য দুর্নীতিসংক্রান্ত যেসকল বিষয় উঠে আসে, তা বোর্ডের নবগঠিত ‘ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের’ কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইন্টিগ্রিটি ইউনিট সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং কোনো বিষয়ে যেন বোর্ডের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ না থাকে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত স্বাধীন চেয়ারম্যান অ্যালেক্স মার্শাল এই ইউনিটটির তত্ত্বাবধান করছেন। একজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের তদারকি এই তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে বোর্ড মনে করে।
বিসিবি কর্তৃপক্ষ বলেছে, ১২তম মৌসুমের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিপিএল-এর সুরক্ষা আরও জোরদার করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে গভর্নিং কাউন্সিল ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের স্বাধীন চেয়ারম্যানের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ গ্রহণ করে। দুর্নীতি দমন ইউনিট স্বচ্ছ ও বিতর্কমুক্ত আয়োজনের লক্ষ্যে পূর্বে ফিক্সিংয়ে জড়িত বা সন্দেহভাজন ক্রিকেটারদের বাইরে রাখার ঘোষণা দিয়েছিল। নিলামের আগের দিনের এই সিদ্ধান্ত তারই বাস্তবায়ন।
বিসিবি’র বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “সেই পরামর্শের ভিত্তিতে কয়েকজন ব্যক্তি, যার মধ্যে খেলোয়াড়ও রয়েছেন, তারা এবারের আসরে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পাননি।” এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বোর্ড প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, তারা দুর্নীতির সব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং ক্রিকেটের ভাবমূর্তি রক্ষায় কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
বাদ পড়া খেলোয়াড়দের অধিকারের বিষয়েও বোর্ড ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র বিপিএল-এর জন্য গৃহীত একটি ‘বিশেষ ব্যবস্থা’, যার লক্ষ্য হলো চলমান তদন্ত প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা বজায় রাখা এবং লিগের সততা রক্ষা করা। এই পদক্ষেপটি বিসিবির অধীনে পরিচালিত অন্য কোনো ঘরোয়া প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ, বাদ পড়া ক্রিকেটাররা বিপিএল ছাড়া বোর্ডের অন্যান্য ঘরোয়া টুর্নামেন্টে খেলতে পারবেন।
বিসিবি আরও উল্লেখ করেছে, “ব্যক্তিগত কিছু বিষয় নিয়ে জনমনে আগ্রহ আছে জানি। তবে ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের অধীনে কোনো পর্যালোচনা বা তদন্ত চলমান থাকাবস্থায় সংশ্লিষ্ট কাউকে নিয়ে মন্তব্য করা উচিত নয়।” এই মন্তব্যটি মূলত খেলোয়াড়দের আইনি পদক্ষেপের হুমকি এবং গণমাধ্যমের আগ্রহের বিষয়ে বোর্ডের সতর্ক ও আইনি অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
উল্লেখ্য, নিলামের জন্য দেশীয় ক্রিকেটারদের চূড়ান্ত তালিকায় সবমিলিয়ে ১৫৮ জনের জায়গা হয়েছে। বাদ পড়া আটজন ক্রিকেটার হলেন— এনামুল হক বিজয়, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, আলাউদ্দিন বাবু, মিজানুর রহমান, নিহাদ-উজ্জামান, সানজামুল ইসলাম, মনির হোসেন খান ও শফিউল ইসলাম। এই কঠোর সিদ্ধান্ত বিপিএল-এর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করল, যা দুর্নীতিমুক্ত ক্রিকেট আয়োজনের জন্য বোর্ডের দৃঢ় প্রতিজ্ঞাকে তুলে ধরে।

