আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আঙিনায় ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক বৈরিতা এবং এর প্রভাব নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘকাল ধরে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ রয়েছে। মাঠের লড়াইয়ে উত্তাপ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই রেষারেষি মানবিক সৌজন্যবোধকেও ছাপিয়ে গেছে। এমনকি এশিয়া কাপের মতো বড় আসরেও দুই দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে ন্যূনতম করমর্দন বা সৌজন্য বিনিময়ের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ক্রিকেটের এই গুমোট পরিবেশ নিয়ে সম্প্রতি মুখ খুলে রীতিমতো তোপের মুখে পড়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার জেসন হোল্ডার। ভারতের কঠোর সমালোচনা করায় এখন তার ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা আইপিএল ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘গেম উইথ গ্রেস’-এ হোল্ডারের দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে। সেখানে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিদ্যমান তিক্ত সম্পর্ক এবং ক্রিকেটে এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সর্বশেষ এশিয়া কাপে ভারত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ট্রফি গ্রহণ না করার যে নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটিকে ‘মাত্রাতিরিক্ত’ বলে অভিহিত করেছেন এই ক্যারিবীয় তারকা।
হোল্ডার বলেন, “ভারত ও পাকিস্তানের এই দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ আমার মোটেও পছন্দ নয়। এটি এখন আর কেবল ক্রিকেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং খেলাধুলার গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে গেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এশিয়া কাপ জয়ের পর ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানানোটা ছিল একেবারেই অপ্রয়োজনীয় একটি আচরণ। এমন কাজ আমাদের এই সুন্দর খেলার ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই নয়।”
হোল্ডার বিশ্বাস করেন, বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্রিকেটারদের অনুসরণ করে এবং তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত আচরণও সংযত হওয়া প্রয়োজন। তার মতে, ক্রিকেটাররা একেকজন বিশ্বদূত। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা যদি বিশ্বশান্তি ও সংহতির কথা বলি, তবে আমাদের আইডল বা অনুসরণীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে এমন সংকীর্ণ আচরণ কাম্য নয়।”
হোল্ডার আরও যোগ করেন যে, ভারত ও পাকিস্তান—উভয়ই ক্রিকেটের মহাশক্তি। তারা যদি অন্তত খেলার মাঠেও ঐক্যবদ্ধ মনোভাব প্রদর্শন করতে পারে, তবে তা বিশ্ববাসীর কাছে একটি ইতিবাচক ও শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেবে। হাত মেলানো বা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মতো ছোট ছোট প্রতীকী উদ্যোগও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে ভারতের ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্তের এমন প্রকাশ্য সমালোচনা সহজভাবে নেয়নি ভারতীয় সমর্থকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই হোল্ডারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। অসংখ্য ভারতীয় অনুরাগী তাকে সরাসরি ‘বয়কট’ করার ডাক দিয়েছেন। বিতর্কের জল গড়িয়েছে আইপিএল পর্যন্ত। নেটিজেনদের একাংশ জোরালো দাবি তুলছেন যেন আসন্ন আইপিএল থেকে জেসন হোল্ডারকে বহিষ্কার করা হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে জনরোষের মুখে পড়ে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাদ দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল। ফলে হোল্ডারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়েছে।
আসন্ন আইপিএল মৌসুমে গুজরাট টাইটান্সের হয়ে মাঠে নামার কথা ছিল জেসন হোল্ডারের। মেগা নিলাম থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি তাকে ৭ কোটি রুপির বিশাল অঙ্কে দলে ভিড়িয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে গুজরাট টাইটান্স তাকে ধরে রাখবে নাকি জনমতের চাপে কোনো বিকল্প সিদ্ধান্ত নেবে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পেশাদারিত্ব বনাম জাতীয় আবেগ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে হোল্ডারের আইপিএল ভাগ্য এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই দেখার বিষয়। ক্রিকেট বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃপক্ষ এবং বিসিসিআইয়ের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার জন্য।

