উত্তর গোলার্ধের হাড়কাঁপানো শীতে বর্তমানে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। মৌসুমের প্রথম দফায় আছড়ে পড়া ব্যাপক ও ভারী তুষারপাতের কবলে পড়ে এখন পর্যন্ত ইউরোপজুড়ে অন্তত ৬ জনের প্রাণহানির সংবাদ পাওয়া গেছে। তুষারঝড়ের তীব্রতায় মহাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে, যার ফলে শত শত আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাজার হাজার যাত্রী বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকা পড়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন।
তুষারপাতের এই ভয়াবহতায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ জনে। এর মধ্যে ফ্রান্সেই ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বাকি একজন দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান রাষ্ট্র বসনিয়া অ্যান্ড হার্জিগোভিনার বাসিন্দা। ফরাসি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ফ্রান্সে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তারা মূলত সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। রাজপথে জমাট বরফে গাড়ির চাকা পিছলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জিগোভিনার রাজধানী সারায়েভোতে এক ব্যক্তি তার চলন্ত গাড়ির ওপর তুষারের ভারে বিশাল গাছ উপড়ে পড়লে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। বলকান অঞ্চলের দেশগুলোতে কেবল তুষারপাতই নয়, সেই সঙ্গে ভারী বর্ষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আবহাওয়ার এই প্রতিকূল পরিস্থিতি নিয়ে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবহনমন্ত্রী ফিলিপ তাবারোত একটি জরুরি বিবৃতি দিয়েছেন। দেশটির আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস উল্লেখ করে তিনি জানান, আগামী কয়েক দিন তুষারপাতের এই দাপট অব্যাহত থাকতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে তিনি অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সম্ভব হলে অফিসিয়াল কাজকর্ম বাড়ি থেকে করার (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডের মোট ৯৬টি জেলার মধ্যে ৩৮টিতে তুষারপাতজনিত ‘কমলা সতর্ক সংকেত’ বা অরেঞ্জ অ্যালার্ট জারি করেছে।
তুষারপাতের প্রত্যক্ষ প্রভাবে ইউরোপের আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের প্রধান বিমানবন্দর ‘রোইসি-চার্লস ডি গাউলে’ গত মঙ্গলবার তাদের নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৪০ শতাংশ বাতিল ঘোষণা করেছে। একই চিত্র দেখা গেছে নেদারল্যান্ডসেও। ডাচ রাজধানী আমস্টারডামের ব্যস্ততম ‘শিফোল বিমানবন্দর’ তুষারঝড় ও দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার কারণে চার শতাধিক ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। রানওয়েতে বরফ জমে থাকা এবং বিমানের ডানা থেকে বরফ পরিষ্কারের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে কোনো কোনো ফ্লাইট কয়েক ঘণ্টা বিলম্বিত হচ্ছে।
ফ্লাইট বাতিলের এই মিছিলে পড়ে ইউরোপের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে হাজার হাজার যাত্রী আটকা পড়েছেন। স্পেনের নাগরিক জাভিয়ের সেপুলভেদা আমস্টারডাম থেকে নরওয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে শিফোল বিমানবন্দরে এসে পৌঁছালেও তাকে সেখানে কয়েক হাজার যাত্রীর মতো আটকা পড়তে হয়েছে। রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বিমানবন্দরের ভেতরকার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আটকে পড়া যাত্রীদের তীব্র উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার কারণে বিমানবন্দরে এক ধরনের কোলাহলপূর্ণ ও হতাশাজনক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সবাই বাড়ি বা গন্তব্যে ফেরার জন্য মরিয়া, কিন্তু প্রকৃতির সামনে আমরা সবাই অসহায়।”
আবহাওয়াবিদদের মতে, মেরু অঞ্চল থেকে আসা শীতল বায়ুপ্রবাহের কারণেই ইউরোপের ওপর দিয়ে এই হিমবাহ বইছে। কেবল ফ্রান্স বা নেদারল্যান্ডস নয়, জার্মানি ও বেলজিয়ামের কিছু অংশেও জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় থেকে শুরু করে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট—সব মিলিয়ে এক অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইউরোপবাসী। উদ্ধারকারী দলগুলো রাজপথ থেকে বরফ সরিয়ে যোগাযোগ স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে, তবে একটানা তুষারপাতের ফলে সেই প্রচেষ্টাও বিঘ্নিত হচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতির সম্ভাবনা নেই বলে ধারণা করা হচ্ছে।

