ইরানে চলমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রকাশ্য সমর্থন এবং তেহরানের ওপর সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকির প্রেক্ষিতে এবার কড়া জবাব দিয়েছেন ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আমির হাতামি।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ‘ফারস নিউজ’ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। জেনারেল হাতামি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো বহিরাগত শক্তির হুমকি বা উসকানিমূলক আচরণ তেহরান নীরবে সহ্য করবে না এবং যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
জেনারেল আমির হাতামি তার বিবৃতিতে বলেন, “ইরানি জাতির বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির যেকোনো বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা পদক্ষেপকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
শত্রুপক্ষ যদি আমাদের শক্তি নিয়ে কোনো ভুল ধারণা পোষণ করে বা কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে নজিরবিহীন।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন যে, ইরানের পাল্টা আঘাত গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘটিত ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চেয়েও বহুগুণ বেশি কঠোর ও বিধ্বংসী হবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রেক্ষাপটটি গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তেহরানের ব্যবসায়ীরা আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের অভাবনীয় দরপতনের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি কেবল অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া থাকলেও দ্রুতই বিক্ষোভটি রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং দেশটির প্রধান প্রধান শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের এই সহিংসতায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩৬ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন ২০০৯ সালের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভ বা ২০২২-২৩ সালের আন্দোলনের মতো অতটা ব্যাপক আকার ধারণ করেনি, তবুও এর আন্তর্জাতিক প্রভাব এখন অত্যন্ত গভীর।
ইরানের এই টালমাটাল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দফায় দফায় তেহরানের শাসকগোষ্ঠীকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন। তিনি সরাসরি বিক্ষোভকারীদের পক্ষ নিয়ে বলেছেন, যদি ইরানি কর্তৃপক্ষ সহিংস উপায়ে সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করে বা অতীতে যেমন মানুষ হত্যা করা হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি ঘটায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর আঘাত আসবে। ট্রাম্পের সুরেই সুর মিলিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ইরানি জনগণের ‘স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার’ প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং তাদের লড়াইকে সমর্থন জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
এই দুই দেশের নেতার এমন বক্তব্যকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় ঐক্য ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা’ এবং ‘সহিংসতায় উসকানি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সোমবার ইরানের এক দাপ্তরিক বিবৃতিতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে বলা হয়, তারা সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মূলে রয়েছে গত জুনের সেই সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিধ্বংসী যুদ্ধ। সে সময় ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই হামলায় ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চরমে পৌঁছেছে। জেনারেল হাতামির সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত সেই যুদ্ধের ক্ষোভ এবং নতুন কোনো বড় আকারের সংঘাতের আশঙ্কারই প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এখন আর কেবল দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির একটি দাবার চালে পরিণত হয়েছে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকটে পিষ্ট সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, অন্যদিকে পারমাণবিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষার লড়াই—সব মিলিয়ে ইরান এখন এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতা এই উত্তেজনার ফলে কতটা বিঘ্নিত হবে, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। তবে জেনারেল হাতামির দেওয়া এই হুঁশিয়ারি এটুকু পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, ইরান যেকোনো সংঘাতের জন্য সামরিকভাবে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

