ভেনেজুয়েলার বামপন্থী সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যেকার চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সামরিক উত্তেজনা নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার ওপর এবং আশপাশের আকাশসীমা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হিসেবে গণ্য করার জন্য এক কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এই ধরনের ঘোষণা আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে দ্রুত সামরিক সংঘাত শুরুর ব্যাপক আশঙ্কা তৈরি করেছে।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালের’ দেওয়া এক পোস্টে এই নির্দেশনামূলক সতর্কবার্তা প্রদান করেন। তার এই পোস্টটি সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা, পাইলট এবং মাদক ও মানব পাচারকারীদের উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে।
ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, “সব এয়ারলাইন্স, পাইলট, মাদক ব্যবসায়ী ও মানবপাচারকারীদের উদ্দেশে বলছি, দয়া করে ভেনেজুয়েলার ওপর ও আশপাশের আকাশসীমাকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হিসেবে বিবেচনা করুন।”
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আকস্মিক ঘোষণার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো দাপ্তরিক তথ্য বা সামরিক নির্দেশিকা তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি, তবুও ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই সতর্কবার্তাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করতে ক্যারিবীয় অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক সামরিক সদস্য মোতায়েন করেছে, যেখানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিমানবাহী রণতরীও অবস্থান করছে।
ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ক্যারিবীয় অঞ্চলে এই ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি ও অভিযান পরিচালনার মূল লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলা থেকে পরিচালিত মাদক পাচার কার্যক্রম দমন করা। উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোসহ দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের অভিযোগ এনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আগে থেকেই চাপ সৃষ্টি করে আসছে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার সরকার (কারাকাস) দৃঢ়ভাবে অভিযোগ করে আসছে যে, মাদক দমনের নামে নেওয়া এই পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আসল উদ্দেশ্য নয়। তাদের মতে, ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সরকার পরিবর্তন করাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার মূল লক্ষ্য। কারাকাস এটিকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় সাগর এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ভেনেজুয়েলার কথিত মাদকবাহী ২০টিরও বেশি নৌযানকে লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে। এসব হামলায় ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এই অভিযানগুলোর পর ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি যে, লক্ষ্যবস্তু করা নৌযানগুলো আসলেই মাদক পাচারের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল কিংবা সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি ছিল। এই প্রমাণাদির অনুপস্থিতি আঞ্চলিক উত্তেজনা ও বিতর্কের পালে হাওয়া দিয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক অভিযান এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির কারণে আঞ্চলিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এই উত্তেজনা বেসামরিক বিমান চলাচল খাতকেও প্রভাবিত করেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (এফএএ) ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় পরিচালিত বেসামরিক সব ফ্লাইটকে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সামরিক কার্যক্রম বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছিল।
এই কঠোর সতর্কতার পরপরই দক্ষিণ আমেরিকার প্রধান ছয়টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স ভেনেজুয়েলায় তাদের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ভেনেজুয়েলা সরকার (কারাকাস) তীব্র ক্ষুব্ধ হয়ে স্পেনের আইবেরিয়া, পর্তুগালের ট্যাপ, কলম্বিয়ার অ্যাভিয়ানকা, চিলি ও ব্রাজিলের লাতাম, ব্রাজিলের গোল এবং তুর্কিশ এয়ারলাইন্সকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ভেনেজুয়েলার অভিযোগ, এই এয়ারলাইন্সগুলো কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছে।
সামরিক উত্তেজনা যখন চরমে, ঠিক তখনই এক ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। গত শুক্রবার মার্কিন দৈনিক ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের’ এক প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর মধ্যে টেলিফোনে আলাপ হয়েছে। এমনকি এই দুই নেতার মাঝে যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় স্থলপথে মাদক পাচার প্রতিরোধে আরও পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দেওয়ার একদিন পরেই মাদুরোর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি এই ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা এক অপ্রত্যাশিত মোড় নিয়েছে, যা এই সংকটের বহুমুখী জটিলতা নির্দেশ করে।
ট্রাম্পের আকাশসীমা বন্ধের এই আকস্মিক সতর্কতা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর বিপুল সমাবেশ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে কোনো সময় সামরিক সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহল আশঙ্কা করছে। সামরিক চাপ, কূটনৈতিক নাটকীয়তা এবং মাদক পাচার দমনের দ্বিমুখী নীতির কারণে ভেনেজুয়েলা সংকট বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অন্যতম জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অচলাবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

