লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়ে এবার সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক গ্রেপ্তারের ঘটনার পর এই উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ট্রাম্পের পরোক্ষ হুমকির জবাবে কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো অত্যন্ত কঠোর ভাষায় পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, “আমাকে ধরতে আসুন। আমি এখানেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।”
সোমবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে তার দেশের অনড় অবস্থানের কথা জানান। পেত্রোর এই মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে এক চরম সাহসিকতা এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
প্রেসিডেন্ট পেত্রো ভেনেজুয়েলায় পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেন যে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও রূপক অর্থে উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কলম্বিয়ায় বোমা হামলা চালানোর পরিকল্পনা করে, তবে সে দেশের সাধারণ কৃষকরা নিমিষেই পাহাড়ে হাজার হাজার গেরিলা যোদ্ধায় পরিণত হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ যাকে ভালোবাসে এবং সম্মান করে, সেই রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর আঘাত এলে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বা ‘জাগুয়ার’ ছেড়ে দেওয়া হবে। এক সময়ের গেরিলা যোদ্ধা থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া পেত্রো স্পষ্ট করে দেন যে, যদিও তিনি শান্তির পথে থেকে অস্ত্র ত্যাগ করার শপথ নিয়েছিলেন, কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনে তিনি পুনরায় অস্ত্র হাতে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবেন না।
এই বাকযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে গত রবিবার, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা অভিযান পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে কলম্বিয়ার বর্তমান নেতৃত্ব সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। ট্রাম্প দাবি করেন, কলম্বিয়া বর্তমানে এমন একজনের হাতে পরিচালিত হচ্ছে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার ও কোকেন বিক্রিতে মদদ দেন। ট্রাম্প কলম্বিয়াকে একটি ‘অসুস্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করে ইঙ্গিত দেন যে, খুব শীঘ্রই দেশটিতে পরিস্থিতির পরিবর্তন আনা হবে।
এমনকি কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তাবটি তার কাছে ‘বেশ ভালো’ মনে হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের এমন প্রকাশ্য হুমকিতে অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে খাদের কিনারায় নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই উস্কানিমূলক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কলম্বিয়া সর্বদা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংলাপ, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর হুমকি প্রদান বা শক্তি প্রয়োগের অপচেষ্টাকে তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
উল্লেখ্য যে, গত বছরের অক্টোবরে ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ মাদক ব্যবসার অভিযোগে পেত্রো এবং তার পরিবারের সদস্যদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কলম্বিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কোকেন উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও, পেত্রো সরকার বারবার দাবি করে আসছে যে তারা মাদক নির্মূলে কাজ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোও এর আগে ট্রাম্পকে একইভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। মাদুরো বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাকে গ্রেপ্তার করতে চায়, তবে তিনি কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদেই অবস্থান করবেন। তবে গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর এক ঝটিকা অভিযানে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হন।
এই ঘটনার পর হোয়াইট হাউস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিদ্রূপাত্মক ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে মাদুরোর সেই চ্যালেঞ্জ এবং পরে তার গ্রেপ্তারের দৃশ্যগুলো তুলে ধরা হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ভিডিওতে মন্তব্য করেন যে, মাদুরোর কাছে সমঝোতার সুযোগ ছিল, কিন্তু তিনি তা হারিয়েছেন।
বর্তমানে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে রয়েছেন এবং নিউইয়র্কের একটি আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। মাদুরোর এই পরিণতি দেখার পরও গুস্তাভো পেত্রোর এমন প্রকাশ্য ঘোষণা লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পেত্রো মূলত তার দেশের জাতীয়তাবাদী আবেগকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এই পরিস্থিতির ফলে দক্ষিণ আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতি এবং কলম্বিয়ার সাথে তাদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্পর্ক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন পেত্রোর এই সরাসরি চ্যালেঞ্জের বিপরীতে সামরিক কোনো পদক্ষেপ নেয় নাকি কূটনৈতিক উপায়ে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করে।

