ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর দুঃসাহসিক অভিযান এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটকের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির এক চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ। মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই সামরিক পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। সংস্থাটি মনে করে, ওয়াশিংটনের এই একতরফা পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে সার্বভৌমত্বের আইনি কাঠামোকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী কর্তৃক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রধানকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক আইনের সেই মৌলিক নীতিকে পদদলিত করেছে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে—কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ কিংবা হুমকি প্রদর্শন করতে পারবে না।
গত ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের মধ্যরাতে মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ফোর্স ‘ডেল্টা ফোর্স’ কারাকাসের অত্যন্ত সুরক্ষিত প্রেসিডেন্সিয়াল কম্পাউন্ডে হামলা চালিয়ে নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘ধ্বংসাত্মক ডিভাইস ব্যবহারের ষড়যন্ত্র’সহ বিভিন্ন অভিযোগে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটন এই হস্তক্ষেপের সপক্ষে ভেনেজুয়েলা সরকারের দীর্ঘদিনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ডকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও জাতিসংঘ তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
জাতিসংঘের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অজুহাতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ভেনেজুয়েলার জনগণ অবশ্যই ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য, তবে তা হতে হবে একটি নিরপেক্ষ, বৈধ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।”
এদিকে, মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ডেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে এই নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সাধারণ ভেনেজুয়েলবাসীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সাম্প্রতিক ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। ট্রাম্প অঙ্গীকার করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় তেল কোম্পানিগুলোর সহায়তায় ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে ওয়াশিংটন। এই বক্তব্যকে অনেকেই আধুনিক ‘সম্পদ দখল’-এর রাজনীতি হিসেবে দেখছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর আশঙ্কা করছে যে, এই আকস্মিক সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ভেনেজুয়েলার রাজপথে বিপুল পরিমাণ বিদেশি সেনার উপস্থিতি দেশটিকে আরও চরম বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেবে। গত এক দশক ধরে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সংকট ও মানবাধিকার পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছিল, বর্তমান সামরিকীকরণ ও অস্থিতিশীলতা তাকে আরও বহুগুণ শোচনীয় করে তুলবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই ‘ডনরো ডকট্রিন’ বা আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করল। যদি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এভাবে অন্য দেশের সরকার প্রধানদের অপহরণ বা আটক করতে শুরু করে, তবে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব অর্থহীন হয়ে পড়বে। বর্তমানে নিকোলাস মাদুরোর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে যেমন কৌতূহল রয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে।

