দক্ষিণ আমেরিকায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে এক নাটকীয় অভিযানে আটকের পর এবার মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দেশ ইরানের দিকে নজর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া হুঁশিয়ারি এবং রিপাবলিকান সিনেটরদের আগ্রাসী অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ২০২৬ সাল হতে যাচ্ছে ইরানের জন্য এক বিশাল পরিবর্তনের বছর। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইরান যদি চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা বন্ধ না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করতে ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ বা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
গত সোমবার মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ফক্স নিউজের একটি অনুষ্ঠানে ‘মেক ইরান গ্রেট অ্যাগেইন’ (ইরানকে আবারও মহান করুন) লেখা একটি কালো টুপি পরে হাজির হন, যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, “আমি প্রার্থনা করি এবং আশা করি যে, ২০২৬ সাল হবে সেই বছর যখন আমরা ইরানকে তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেব।” বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই স্লোগানটি আসলে ইরানে বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর একটি প্রচ্ছন্ন সংকেত। গ্রাহামের এই মন্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানে বর্তমানে জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয় বৃদ্ধি এবং রিয়ালের নজিরবিহীন পতনের কারণে ব্যাপক অস্থিরতা বিরাজ করছে। টানা ৯ দিন ধরে চলা এই বিক্ষোভে ইতিমধ্যে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন এবং শত শত বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ইরান সরকারকে এক চরম চাপের মুখে ফেলেছে। ট্রাম্প বলেছেন, “ইরান যদি অতীতের মতো বিক্ষোভকারীদের ওপর নৃশংসতা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে। আমরা তাদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।”
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটকের ঘটনাটি ট্রাম্পের ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর প্রথম বড় ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই নীতির আওতায় ট্রাম্প পশ্চিম গোলার্ধসহ বিশ্বের অন্যান্য কৌশলগত স্থানে মার্কিন প্রভাব সুসংহত করতে সামরিক শক্তি ব্যবহারে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছেন না। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট তাদের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ইরান যদি বিক্ষোভ দমনে সহিংস পথ বেছে নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সেখানেও ভেনেজুয়েলার মতো সীমিত বা পূর্ণ মাত্রার কোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণ সমর্থন দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তেহরান অবশ্য মার্কিন এই হুমকিকে ‘বেপরোয়া ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, ইরানের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানলে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। ইরান ইতিমধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই উসকানিমূলক বার্তার বিচার দাবি করেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ট্রাম্পের এমন হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
তবে ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়। ভেনেজুয়েলার পর কলম্বিয়া, মেক্সিকো, কিউবা এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড নিয়েও ওয়াশিংটনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের একটি বড় অংশ মনে করে, বিশ্বজুড়ে রাশিয়ার ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে এমন আগ্রাসী পদক্ষেপে ফেরা ছাড়া বিকল্প নেই। বর্তমান এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপ কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

