বলিউড অভিনেতা সুনীল শেঠির কন্যা তথা অভিনেত্রী আথিয়া শেঠিকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। আথিয়ার স্বাক্ষর জাল করে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মুম্বাই পুলিশ তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন একটি নামী বিজ্ঞাপনী সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ঋষভ সুরেকা, সংস্থার মালিক যশ নাগরকোটি এবং অপর সহযোগী অশায় শাস্ত্রী। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ভারতের বিনোদন এবং কর্পোরেট জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যেখানে তারকাদের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার এক নতুন কৌশল উন্মোচিত হয়েছে।
তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, এই প্রতারণা চক্রের মূল হোতা ঋষভ সুরেকা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে আথিয়া শেঠির ব্যক্তিগত পরিচয় ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছিলেন। অভিযোগ উঠেছে যে, ঋষভ সুরেকা শুধুমাত্র আথিয়ার স্বাক্ষরই জাল করেননি, বরং অভিনেতা আরশাদ ওয়ারসীর নামেও একটি ভুয়া ই-মেইল অ্যাকাউন্ট তৈরি করেছিলেন। এই ভুয়া ই-মেইলের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতেন, যাতে কেউ তাকে সন্দেহ না করে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই জালিয়াতি চালানো হচ্ছিল এবং এর ব্যাপ্তি ছিল বিশাল।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে। পুলিশি তথ্যানুযায়ী, অভিযুক্ত ঋষভ সুরেকা সেই সময় আথিয়া শেঠির ব্যক্তিগত সহকারী ও ব্যবস্থাপনা দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একটি নামী জুয়েলারি ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনী প্রচারণার জন্য আথিয়াকে চুক্তিবদ্ধ করার প্রস্তাব দেন তিনি। প্রাথমিকভাবে এই কাজের জন্য ৪০ লাখ ভারতীয় রুপির একটি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত আথিয়ার পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সম্মতি পাওয়া যায়নি এবং আলোচনাটি সেখানেই থমকে যায়। কিন্তু ঋষভ সুরেকা সেই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট জুয়েলারি ব্র্যান্ডটিকে আশ্বস্ত করেন যে, আথিয়া শেঠিই তাদের বিজ্ঞাপনে কাজ করতে রাজি হয়েছেন। নিজের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি আথিয়া শেঠির স্বাক্ষর অত্যন্ত নিপুণভাবে জাল করে একটি ভুয়া চুক্তিপত্র তৈরি করেন।
উক্ত ব্র্যান্ডটি জাল চুক্তিপত্রকে আসল মনে করে ঋষভকে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করে। শুধু আথিয়া একাই নন, ঋষভ সুরেকা আথিয়ার স্বামী তথা ভারতীয় ক্রিকেট তারকা কেএল রাহুলের নাম ব্যবহার করেও বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পারিবারিক পরিচয়ে আস্থার সুযোগ নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও ব্র্যান্ডগুলোকে বিভ্রান্ত করা ছিল এই চক্রের প্রধান কৌশল। মুম্বাই পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে যে, অভিযুক্ত ঋষভ সুরেকা ২০২৩ সালে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপনী সংস্থায় যোগদানের পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সংস্থায় যোগ দেওয়ার পরপরই তিনি নিজের মায়ের চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে সংস্থা থেকে ১৫ লাখ রুপি ব্যক্তিগত ঋণ গ্রহণ করেন, যা পরবর্তীতে পরিশোধ করেননি।
ঋষভের প্রতারণার তালিকা এখানেই শেষ নয়। তদন্তে আরও দেখা গেছে যে, তিনি অভিনেত্রী দিয়া মির্জার নাম ব্যবহার করেও জালিয়াতির চেষ্টা চালিয়েছিলেন। দিয়া মির্জাকে একটি বিজ্ঞাপনী প্রচারণায় কাজ করানোর প্রলোভন দেখিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে ৬২ লাখ রুপি হাতিয়ে নেওয়ার একটি পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সেই চেষ্টাটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সব মিলিয়ে এই চক্রটি কোটি কোটি টাকার একটি বিশাল জালিয়াতির জাল বিছিয়েছিল, যার শিকার হয়েছেন নামী তারকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।
আথিয়া শেঠির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন যে, এই ধরণের জালিয়াতির ঘটনা সম্পর্কে তারা আগে থেকে অবগত ছিলেন না এবং অভিনেত্রীর স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। বর্তমানে মুম্বাই পুলিশের বিশেষায়িত দল এই মামলার তদন্ত পরিচালনা করছে। গ্রেপ্তারকৃত তিন অভিযুক্তকে পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে যাতে এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা তা শনাক্ত করা যায়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এই ধরণের প্রতারণার নেপথ্যে আরও বড় কোনো চক্র থাকতে পারে যারা বলিউডের তারকাদের নাম ও প্রভাবকে পুঁজি করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় নাম জড়িয়ে যাওয়ায় আথিয়া শেঠি বর্তমানে সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন, বরং একজন ভুক্তভোগী হিসেবেই তার নাম উঠে এসেছে। সাইবার ও আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তারকাদের ইমেজ ও সই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল যুগে স্বাক্ষর জাল করা এবং ভুয়া ই-মেইল তৈরি করা অপরাধীদের জন্য সহজ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডগুলোকে সরাসরি তারকাদের মূল প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
মুম্বাই পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঋষভ সুরেকা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, পরিচয় গোপন করে অপরাধ সংঘটন এবং চুরির ধারায় মামলা রুজু করেছে। আথিয়া শেঠির মতো ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে এই ধরণের জঘন্য প্রতারণা বিনোদন জগতে নিরাপত্তার অভাবকে আবারও সামনে এনেছে। পুলিশি হেফাজতে থাকা অভিযুক্তদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হচ্ছে এবং আশা করা হচ্ছে যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই কোটি টাকার জালিয়াতির সম্পূর্ণ রহস্য উদঘাটিত হবে। এই সংকটময় মুহূর্তে আথিয়া শেঠির পরিবার ও ভক্তরা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন, যাতে এই ধরণের প্রতারণার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়।

