দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের লক্ষ্যে পরিচালিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সামরিক অভিযানে প্রাণহানির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৮০-তে দাঁড়িয়েছে। গত শনিবার মধ্যরাতে রাজধানী কারাকাসসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় মার্কিন বিমানবাহিনী ও বিশেষ বাহিনীর (ডেল্টা ফোর্স) সমন্বিত এই হামলা পরিচালিত হয়। নিউইয়র্ক টাইমস ভেনেজুয়েলার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, নিহতদের মধ্যে যেমন দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রয়েছেন, তেমনি বেশ কিছু সাধারণ বেসামরিক নাগরিকও এই প্রাণঘাতী অভিযানের বলি হয়েছেন।
গত ৩ জানুয়ারি মধ্যরাতে পরিচালিত এই অভিযানে মার্কিন বিমানবাহিনী ভেনেজুয়েলার কৌশলগত সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক বোমা বর্ষণ করে। এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা। মার্কিন কমান্ডোরা সফলভাবে তাদের বন্দি করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যেতে সক্ষম হলেও, এর চড়া মূল্য দিতে হয়েছে ভেনেজুয়েলা ও তার মিত্রদের। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এই আক্রমণকে একটি ‘নৃশংস ও অবৈধ হামলা’ হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেছেন যে, এই অভিযানের পেছনে নির্দিষ্ট কিছু ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কাজ করেছে। তিনি এই ঘটনাকে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেন।
এই অভিযানের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিকটি হলো কিউবার উচ্চপদস্থ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মৃত্যু। কিউবা সরকার আজ সোমবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, কারাকাসে মাদুরোর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কিউবার সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ৩২ জন সদস্য মার্কিন হামলায় নিহত হয়েছেন। এই সাহসী যোদ্ধাদের স্মরণে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল দেশটিতে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। কিউবান বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের কর্মীরা ভেনেজুয়েলার অনুরোধে সরকারি মিশনে নিয়োজিত ছিলেন এবং মার্কিন আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্মুখ সমরে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলা ও কিউবার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক মৈত্রীর কারণে নিকোলাস মাদুরোর নিরাপত্তার একটি বিশেষ অংশ কিউবান গোয়েন্দাদের ওপর ন্যস্ত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে আটকের সময় তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতে মার্কিন বাহিনীকে তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়, যার ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে একটি ‘অকল্পনীয় বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করলেও কোনো মার্কিন সেনা নিহতের খবর নিশ্চিত করেননি, যদিও কয়েকজন সেনা আহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে নিকোলাস মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেস নিউইয়র্কের ব্রুকলিনস্থ মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে কড়া প্রহরায় বন্দি রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও অস্ত্র চোরাচালানসহ গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। আজ ৫ জানুয়ারি বিকেলে তাদের ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সরকারের সমর্থকরা রাজপথে নেমে এই ‘অপহরণ’ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে রাশিয়া, চীন ও ইরান এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ অনেক সামরিক স্থাপনা এখনও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে।

