২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এখন তার অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয় জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর দলটির ভেতরে শুরু হয়েছে তীব্র আদর্শিক সংঘাত ও পদত্যাগের হিড়িক। অভ্যুত্থানের মূল কারিগরদের একটি বড় অংশ ‘জামায়াত ট্যাগ’ এড়াতে এবং জুলাইয়ের বিপ্লবী আদর্শ ধরে রাখতে দল থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে নেওয়া এই ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ শেষ পর্যন্ত নতুন এই দলটিকে ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে।
গত ৭ ডিসেম্বর এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে মিলে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠন করলেও, তার মাস না যেতেই ২৮ ডিসেম্বর নাটকীয়ভাবে জামায়াতের জোটে নাম লেখায় এনসিপি। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম একে ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে নির্বাচনী সমঝোতা’ হিসেবে অভিহিত করলেও দলের একটি বড় অংশ তা মেনে নিতে পারেনি। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা এবং দলটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়ে এনসিপির অন্তত ৩০ জন কেন্দ্রীয় সদস্য লিখিতভাবে তাদের তীব্র আপত্তি ও শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন।
আদর্শিক এই লড়াইয়ের জেরে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, যিনি ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার সঙ্গে পদত্যাগকারীদের দীর্ঘ তালিকায় রয়েছেন যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন এবং তাজনূভা জাবীনের মতো প্রথম সারির নেতারা। পদত্যাগকারী নেতাদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি ছিল ছাত্র-জনতার অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যবিরোধী চেতনা। জামায়াতের মতো একটি বিতর্কিত শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে এনসিপি মূলত সেই শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং ক্ষমতালাভের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়েছে।
পদত্যাগকারী নেতা খান মুহাম্মদ মুরসালীন গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের রাজনীতিকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এনসিপি সেই শক্তিকে সংগঠিত না করে উল্টো দুর্বল হয়ে গেছে। যারা জুলাই ঘটিয়েছেন, তারা আজ চরম নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে আছেন। এই ফ্যাসিবাদের বিলোপ ঘটিয়ে নতুন ব্যবস্থা গড়ার অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হওয়ায় আমরা দল ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।”
অন্যদিকে, এনসিপির বর্তমান নেতৃত্বে থাকা জয়নাল আবেদীন শিশির এই পদত্যাগের ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ ও ‘সহযোদ্ধাদের অভিমান’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ভারতীয় আধিপত্যবাদ নির্মূল এবং পুরাতন এস্টাব্লিশমেন্ট ভেঙে স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এটি একটি কৌশলগত সমঝোতা মাত্র। তারা মনে করেন, পদত্যাগকারী নেতারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে পারতেন।
নেতৃত্বের এই সংকটের মধ্যেই এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ মুখ ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি দলটির মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধানের দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে আন্দোলনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি বর্তমান এনসিপির কোনো অংশ হবেন না।
বর্তমানে এনসিপির ভেতরে এক ধরনের ‘ধীরে চলো’ ও ‘নির্বাচনী প্রস্তুতি’র মিশ্র অবস্থা বিরাজ করছে। নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও আখতার হোসেনের মতো শীর্ষ নেতারা এখনো দলে অটল থাকলেও, তৃণমূল ও মধ্যম সারির নেতাদের পদত্যাগ দলের সাংগঠনিক শক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সামনের নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে এই জোট এনসিপিকে সফল করবে নাকি জুলাইয়ের আন্দোলনের জনসমর্থন থেকে বিচ্ছিন্ন করবে—তাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, আদর্শ ও কৌশলের লড়াইয়ে এনসিপি এখন ইতিহাসের কঠিনতম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

