ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক নাটকীয় পরিবর্তনের পর বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো দেশটির বিশাল তেল সম্পদ। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিয়েছেন।
অনেক বিশ্লেষক একে নিছক রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখলেও এর গভীরে রয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কৌশলগত অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ। যুক্তরাষ্ট্রের নিজের বিপুল পরিমাণ তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতি এই বিশেষ আকর্ষণের কারণ মূলত তেলের গুণগত মান, শোধনাগারের কারিগরি সক্ষমতা এবং ভৌগোলিক কৌশল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার তেলের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে যা দেশ দুটিকে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থা ‘ইআইএ’-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব খনি থেকে যে তেল উত্তোলিত হয় তা মূলত ‘লাইট সুইট ক্রুড’ বা হালকা ও স্বাদে মিষ্টি প্রকৃতির। এই তেল থেকে গ্যাসোলিন বা পেট্রোল তৈরি করা সহজ হলেও ভারী জ্বালানি তৈরির ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার তেল হলো ‘হেভি সাওয়ার ক্রুড’ বা অত্যন্ত ভারী ও ঘন প্রকৃতির। এই আঠালো তেল উত্তোলন ও পরিশোধন করা বেশ জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ হলেও এর বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। ভেনেজুয়েলার এই ভারী তেল পরিশোধন করে উন্নতমানের ডিজেল, জেট ফুয়েল, অ্যাসফল্ট এবং কলকারখানার ভারী যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের অধিকাংশ তেল শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলো ঐতিহাসিকভাবেই এই ভারী তেল পরিশোধনের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। মার্কিন শোধনাগারগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশই ভারী তেল ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ফলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও, তার শোধনাগারগুলো সচল রাখতে এবং ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে ভেনেজুয়েলার মতো উৎস থেকে ভারী তেল আমদানি করা তাদের জন্য অপরিহার্য। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্য বা রাশিয়ার চেয়ে ভেনেজুয়েলা ভৌগোলিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কাছে হওয়ায় এই তেল পরিবহনে সময় ও ব্যয়—উভয়ই অনেক কম পড়ে।
ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের বিশালতাও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের একটি বড় কারণ। ইউএস অ্যানার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাব অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার ওরিনোকো বেল্টে কমপক্ষে ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল তেলের মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এমনকি সৌদি আরবের চেয়েও ভেনেজুয়েলার তেলের রিজার্ভ বেশি। তবে বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা, কারিগরি ত্রুটি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই বিশাল ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও দেশটি দৈনিক মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করতে পারে, যা বিশ্ব বাজারের চাহিদার তুলনায় ১ শতাংশেরও কম। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত এই বিশাল মজুতকে মার্কিন প্রযুক্তিতে সংস্কার করে উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বা ‘এনার্জি ডমিনেন্স’ নিশ্চিত করতে চায়।
পরিশেষে, ভেনেজুয়েলার ওপর এই নিয়ন্ত্রণ কেবল তেলের বাজারের দখল নয়, বরং এটি একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক চাল। দীর্ঘকাল ধরে ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা ছিল চীন ও রাশিয়া। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ সরাসরি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে চলে আসলে বেইজিং ও মস্কোর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহের শিকলে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। সব মিলিয়ে, তেলের বিশেষ গুণাগুণ, মার্কিন রিফাইনারিগুলোর প্রয়োজনীয়তা এবং বিশ্ব রাজনীতিতে চীন-রাশিয়াকে কোণঠাসা করার কৌশলই মূলত ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতি হোয়াইট হাউসের এই তীব্র আগ্রহের মূল রহস্য।

