ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব এবং চরম নাটকীয় মোড় নিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক এক অভিযান। রাজধানী কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার কৌশলগত বিভিন্ন পয়েন্টে আকস্মিক হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত সামরিক শাখা ‘ডেল্টা ফোর্স’। এই দুঃসাহসিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিকোলাস মাদুরো বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন এবং তাকে মার্কিন বিচারিক হেফাজতে রাখা হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করা এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী বা বর্তমান প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ ও ‘সাহসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নেতানিয়াহু তার বার্তায় উল্লেখ করেন, “শুভেচ্ছা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে আপনার এই সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের জন্য আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাই। একইসাথে আমি মার্কিন সেনাদের অকুতোভয় দৃঢ় সংকল্প এবং পেশাদারিত্বকে স্যালুট জানাচ্ছি।” ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই প্রকাশ্য সমর্থন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের অভিন্ন অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
মার্কিন বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে মাদক সন্ত্রাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগ প্রধান। নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে তার এই অপরাধগুলোর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ ও রাজনৈতিক চাপ বজায় রেখে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সরাসরি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে অন্য দেশে ধরে নিয়ে আসার ঘটনা আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের পরিমণ্ডলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কারাকাস থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত শনিবার চালানো এই অভিযানে মার্কিন বিমান ও স্থল বাহিনী সমন্বিতভাবে অংশ নেয়। অভিযানের সময় ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধের খবর পাওয়া গেলেও ডেল্টা ফোর্সের ঝটিকা অভিযানে মাদুরোকে কাবু করা হয়। বর্তমানে মাদুরোকে যে কারাগারে রাখা হয়েছে, সেখানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই পদক্ষেপ কেবল ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার নয়, বরং উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে মাদকের বিস্তার রোধেও বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে, এই সামরিক পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ এই ঘটনাকে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানালেও, অনেক পশ্চিমা দেশ একে স্বৈরতন্ত্রের পতনের সূচনা হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মতো প্রভাবশালী বিশ্বনেতার প্রকাশ্য সমর্থন ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাড়তি নৈতিক সমর্থন জোগাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার ফলে দক্ষিণ আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের রদবদল ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।

